রুকইয়াহ করার আগে

লিখেছেনঃ উম্মে আব্দুল্লাহ

আজকাল গ্রুপে এবং ইনবক্সে আপুরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলেন তা হলো, “বিয়ে বন্ধ আর বাচ্চা না হওয়া...”

এই দুটো বিষয় নিয়েই আব্দুল্লাহ রুকিয়া সিরিজে লিখেছে। আপুরা যদি পোষ্টগুলো পডে নিতেন, তাহলে এই বিষয়ে যথেষ্ট ধারনা চলে আসত। কিন্তু আপুদের প্রশ্ন শুনলে মনে হয় দু’লাইন পড়তে অনেক কষ্ট, তাই লেখাগুলো না পড়েই প্রশ্ন শুরু করে দেন।  আমার কথা হচ্ছে আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আপনি রুকিয়া করবেন। তাহলে লেখাগুলো একটু ভালো করে পড়েন। এরপর না যদি কিছু না বুঝেন তখন প্রশ্ন করেন। কিছুই না জানা থাকলে এভাবে খুঁটিনাটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া আসলেই অনেক কঠিন। আমরাও তো মানুষ। দুনিয়াবি কাজকর্ম আমাদেরও আছে। একটু বিবেচনায় রাখবেন প্লিজ। যাই হোক, এবার আসল কথায় আসি।

রুকিয়া করতে গিয়ে বেশিরভাগ আপুই কিছু কমন প্রশ্ন করেন।

১. রুকিয়া করলে সমস্যা ভালো হবে তো?
উত্তর: আল্লাহ তা’আলা চাইলেই হবে। / ইনশাআল্লাহ হবে। এই উত্তরের পরও আবার একই প্রশ্ন কয়েকবার করা হয়। এক্ষেত্রে আমার উত্তর হচ্ছে আমি গায়েব জানিনা। [আসলে এর বেশি বোঝানোর ক্ষমতা আমার নাই]

২. এতদিন(৫/৭ দিন) ধরে রুকিয়া করছি কিছুই তো বুঝিনা।
উত্তর: আপুরে এইটা আলাদীনের চেরাগ না যে ঘষা দিবেন, দৈত্য আসবে, এরপর আবদার করবেন। ব্যাস!! সমাধান হয়ে গেলো.. আমি নিজের জন্য প্রায় দেড় বছর যাবৎ রুকিয়া করছি, এখনও করছি..। আর আপনি এই কয়েকদিনেই হাঁপিয়ে উঠেছেন! আর একটা কথা, সমস্যা তো একদিনের না! তাহলে চিকিৎসার জন্য এত তাড়াহুড়া কেন?

এইবার আপুদের কিছু ভুলের কথা বলি।

প্রথমতঃ একজন মুসলিম হিসেবে যেসব বিষয়ে আমাদের অবশ্যই ঈমান রাখতে হবে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে “তাকদীর।” তাকদীর, মানে আমরা যেটাকে ভাগ্য বা কপাল বলি। একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের এটা বিশ্বাস করতে হবে যে ভালো-মন্দ সবকিছু আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা অনুযায়ী হয়। কিন্তু আমরা কেন হলো কেন হলো করে মাথা খারাপ করে ফেলি। আর আমাদের দুর্দশার জন্য যাদু, জ্বীন এইসব কে দায়ী করি।  অথচ এটা আমাদের নবী কারীম ﷺ এর শিক্ষা না, আর না সাহাবায়ে কিরামের।

আবু মূসা আশআরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “সর্বদা মন্দ পানকারী, যাদুতে বিশ্বাসী (অর্থাৎ বিশ্বাস করে যে, যাদুই সরাসরি প্রভাব ফেলে, আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য ও তার ফায়সালার কারণে নয়) এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী কখনো জানাতে প্ৰবেশ করতে পারবে না।” [সহীহ ইবনে হিব্বান, সনদ হাসান]

আমরা বুঝতে পারছি, যাদু নিজেই প্রভাব ফেলে থাকে, এমন বিশ্বাস করা হতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিষেধ করেন। মুমিনদের বিশ্বাস রাখতে হবে যে, যাদু বা অন্য কিছুতে কোন ক্ষতি করতে পারেনা; বরং তা আল্লাহর ইচ্ছায় এবং তার লিখে রাখার কারণে হয়ে থাকে।

যেমনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তারা যাদু দ্বারা কোন ক্ষতি করতে পারেনা।” (সূরা বাকারা:১০২) সুতরাং আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে যাদু বা অন্যকিছু আমাদের ক্ষতি করতে পারেনা, যদি আল্লাহর ফয়সালা না থাকে।

দ্বিতীয়তঃ বিপদ কি কি কারণে আসে সেগুলো খেয়াল রাখতে হবে (যেমনঃ আমাদের বড়বড় গুনাহের শাস্তির জন্য, ছোট গুনাহ মাফের জন্য, আমাদের অপরাধের ব্যাপারে সতর্ক করার জন্য, আখিরাতে আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য) এসব খেয়াল রেখে সবর করতে হবে, সাধ্য অনুযায়ী সুন্নাহ সম্মত চিকিৎসা করে যেতে হবে।  এর পাশাপাশি বিবিধ ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিনের যেসব মাসনুন আমল রয়েছে, সেগুলোও করতে হবে। এটাই আমাদের নবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ।

আমাদের দুনিয়াবি জীবন নানা সমস্যায় জর্জরিত। এমন কোন মানুষ নেই যিনি নিজেকে সম্পূর্ণ সুখী দাবি করতে পারেন। একেকজন একেক রকমের সমস্যায় আক্রান্ত। এখন প্রতিটা সমস্যার জন্য যে যাদু আর জ্বীন-ভুতকেই দায়ি করতে হবে, এমন তো কোন নিয়ম নেই! অথচ আমরা এটাই করছি। আমাদের বুঝা উচিত, এটা ভুল ধারণা। যা আমাদের প্রকৃত সমাধানে পৌছার অন্তরায় হয়ে আছে।

বিয়ে হচ্ছেনা তো কেউ বিয়ে আটকে রেখেছে, বাচ্চা হচ্ছেনা যাদু করেছে, অসুখ ভালো হচ্ছেনা বান মেরেছে, নামাজ কালামে মন নাই তো জ্বীনে ধরছে- শুধু এইসবই করে বেড়াচ্ছি। আর কোথায় কবিরাজ, কোথায় হুজুর, কোথায় আমেল এইসবই খুঁজে বেড়াচ্ছি।

একবারও ভেবে দেখছিনা, এটা তো দুনিয়াবি জীবন। এখানে তো সমস্যা থাকবেই। এটা কোন গুনাহর কারনে হচ্ছেনা তো? অথবা রব্বুল আ’লামীন আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন না তো?? আমাদের দোয়ার মধ্যে কোন কমতি নেই তো?? আমল কম হচ্ছেনা তো? নাহ! এগুলো একটা বারও আমাদের ভাবায় না।

আচ্ছা আমরা একবার তাঁর উপর ভরসা করি, আমলকে বাড়িয়ে দেই, ইস্তেগফার করি, আর নিজের আখলাককে উন্নত করে দেখিইনা – আমাদের সমস্যা দূর হয় কিনা? সাথে একটু সবর করি আর বিশ্বাস রাখি, আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন তাঁর বান্দাকে কখনো বঞ্চিত করবেন না, আর বান্দার জন্য যা উত্তম ও কল্যাণকর তাই তিনি দান করবেন। তাহলে আর হতাশা আমাদের ওপর ভর করবে না ইনশাআল্লাহ।

আর আল্লাহ তা’আলা তো বলেছেনই, “নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন“। (সূরা বাকারা:১৫৩) “এবং তাদের সবরের প্রতিদানে তাদেরকে দিবেন জান্নাত ও রেশমি পোশাক“। (সুরা দাহর:১২)

এর সাথে সালাত ও ইস্তেগফার তো আছেই। আগেও বলেছি এখনো বলছি, বেশিরভাগ সমস্যার সমাধানই হচ্ছে ইস্তেগফার। এমন বহু ঘটনা আছে যেটাতে শুধুমাত্র ইস্তেগফারেই সমস্যার সমাধান মিলেছে। এছাড়াও আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ধৈর্য্যর সাথে নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।” সূরা বাকারাঃ ৪৫

প্রয়োজনের জন্য সালাতুল হাজত তো আছেই, আর দু’আ কবুলের জন্য রয়েছে তাহাজ্জুদ। আর সালাতই একমাত্র ইবাদাত যেখানে রব্বুল আ’লামীন ও তাঁর বান্দার সরাসরি কথোপকথন হয়। এর থেকে উত্তম আর কি হতে পারে!!

তবে হ্যাঁ আপনার যদি যাদু, জ্বীনজনিত সমস্যার সাথে বেশিরভাগই মিলে যায় তাহলে আপনি রুকিয়া করতে পারেন। প্রয়োজনে শুরুর আগে অভিজ্ঞদের জিজ্ঞেস করে নিবেন, এজন্যই তো সাপোর্ট গ্রুপ। আর একটা কথা হল,  জিন, যাদু আর বদনজরের অনেকগুলো লক্ষন প্রায় একই। আর কেউ জিন বা যাদুতে আক্রান্ত হলে সাধারণত খুব সহজেই তার নজর লেগে যায়। তাই এক্ষেত্রে আগে বদনজরের রুকিয়া করাই উত্তম। অনেক সময় শুধু বদনজরের রুকিয়া করলেই সমস্যা চলে যায় আলহামদুলিল্লাহ। আর বদনজরের সমস্যা আজকাল সবারই থাকে। এটা নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

আর একটা কথা বদনজর মানে অনেকে শুধু খারাপ নজরকেই মনে করেন। অনেকে আবার ভয়ও পান। ভাবেন সবাই খালি খারাপ নজর দেয়। আসলে ব্যাপারটা তা না প্রশংসাও বদনজরের লিষ্টে থাকে। আর আমি তো বলি অন্যের চেয়ে নিজের নজরই বেশি লাগে আমাদের। তাই এইটা নিয়ে না ঘাবড়িয়ে সকাল সন্ধ্যার আমল নিয়মিত করেন আর সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও রুকইয়ার গোসল করেন। আর যদি ইতোমধ্যে এই সমস্যায় ভুগেন, তাহলে আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করে লাগাতার কিছুদিন রুকিয়া করেন, সমস্যা ভালো না হওয়া পর্যন্ত।

অনেকেই এই প্রশ্নটা করেন কতদিন করবো?? উত্তর একটাই, যতদিন পর্যন্ত সমস্যা থাকে। আর কতদিন ধরে আপনি কি ফেস করছেন সেইটা আপনিই ভালো বুঝতে পারবেন।রুকিয়া বিষয়ে আপনার কনসেপ্ট কি ক্লিয়ার? উত্তর যদি হয় হ্যা, তাহলে আপনি রুকিয়া চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।