আমার যদি রুকইয়াহ সেন্টার থাকতো!

লিখেছেনঃ আহমাদ রবিন
.
[দায়মুক্তি কথাবার্তাঃ আমার কোনো সেন্টার নেই। আমি কোনো সেন্টারে বসিও না। কাজেই যারা ভাবছেন “এই লোকেরতো সেন্টার নেই, সেন্টারে বসেও না তার থেকে আর কি শিখবো”- তারা প্লীজ এখানেই ক্ষান্ত দেন। নিচে নেমে আর সময় নষ্ট করবেন না।]
.
একজন পেশেন্টকে কিভাবে সামলানো উচিত- এ নিয়ে আমি মনেকরি প্রত্যেক রাক্বী ভাইয়ের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। কিভাবে আরও ভালভাবে সামলানো যায়-সেটাও ভেবে-চিন্তে বের করা উচিত। তাহলেই ইনশাআল্লাহ সার্ভিস আরও উন্নত হবে। সেন্টার নেই বলে, ভাবতে পারবো না- এমন বিধিনিষেধতো কেউ জারি করে নি। আর আমার ভাবনা কাউকে গ্রহণ করতেই হবে-এটাও আমি মনে করি না।
.
1️⃣ আমি চাইবো কেউ যখন আমার কাছে কোনো সমস্যা নিয়ে আসে তার আস্থা অর্জন করার জন্য যে, “ভাই, আপনি সঠিক পথে চলতে চেয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে পথ দেখিয়েছেন। ইন শা আল্লাহ আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। কুরআন ও সুন্নাহমত চিকিৎসা পদ্ধতি ফলো করেন। এটা সঠিক রাস্তা। আর আগে কি করেছেন না করেছেন সেগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চেয়ে নিন। আপনার সমস্যা যত জটিলই হোক, আল্লাহর তায়ালার জন্য এটা খুবই সহজ। আপনি আল্লাহর থেকে চেয়ে নিন। বাকি আপনাকে আমার পক্ষ থেকে যতটুকু পরামর্শ দেয়ার ইন শা আল্লাহ পাবেন।”
.
2️⃣ রোগীকে বিব্রত না করতে চেষ্টা করবো। এমন কোনো প্রশ্ন তার অভিভাবকের সামনে করবো না। যদি দরকার হয় কাগজে লিখে দিয়ে জানতে চাইবো। বলবো লিখে দিতে। দেয়ার পর উত্তর দেখে কাগজ ফিরিয়ে দিব। তার সিক্রেট তার কাছেই থাক।
.
3️⃣ রোগ নিয়ে রোগীর সাথে আলোচনা করতাম না। চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করতাম। আপনার এই হয়েছে, ঐ হয়েছে, এতগুলা জাদু করেছে, ততগুলা জাদু করেছে, অমুক জায়গার জাদু করেছে, কঠিন জাদু করেছে, এতগুলা জিন, ততগুলা জিন – এসব বলতাম না। কারণ এসব কথার সলিড কোনো প্রমাণ নেই। যদি বলতে হয় এতটুকুই বলতাম, “সুস্থ হোন। এরপর ইনশাআল্লাহ আমার কিছু ধারনার কথা বলবো।” আর রোগীর অভিভাবককে বলতাম, “উনার দিয়ে খেয়াল রাখবেন। অনেকদিন ধরে অসুস্থ। আপনাদের সাপোর্ট ছাড়া হয়ত পারবেন না।”
.
4️⃣ রোগীর ভিতরে যেন ওয়াসওয়াসার তৈরি না হয় এদিকে বিশেষ যত্ন দিতাম। এটা রোধের একমাত্র উপায় রোগ, বদনজর, জ্বিন, যাদু নিয়ে কথা না বলা। ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করি। প্রথম প্রথম যখন গ্রুপে কাজ শিখলাম বা শুরু করলাম তখন যেদিকে তাকাই সেদিকেই রুকইয়াহ রোগী। এমনি এখনো রাস্তাঘাটে হালকা, ভংগুর স্বাস্থ্যের কাউকে দেখলে মনেহয় এর নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। রুকইয়াহ করানো উচিত। আমার মনে হয় মেডিক্যাল স্টুডেন্ট, ফাউল কোয়ান্টামের সদস্যগণ, সাইকোলজির চিকিৎসকরাও হয়ত সবাইকে নিজ নিজ ক্যাটাগরিতে ফেলতে চান প্রথম দিকে। একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে যখন আমার এমন ওয়াসওয়াসা হতে পারে তাহলে দীর্ঘদিন ধরে যারা বদনজর, জ্বিন, জাদুর সমস্যায় আক্রান্ত তারা কেমন ওয়াসওয়াসা ফিল করতে পারে! ভেবে দেখার বিষয় নয় কি? কল থেকে সাদা পানি এসেছে-জিনে করেছে; পাশের বাসার ভাবি খাবার দিয়ে গিয়েছে-মনে হয় জাদু করতে চায়; ঘরের তেলাপোকা, টিকটিকিগুলা নির্ঘাত জ্বিন; – এই টাইপের ওয়াসওয়াসায় পড়ে যে নিজের জীবন দুর্বিষহ করবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হল, ওয়াসওয়াসার রোগী সবচে’ শক্ত রোগী। এরা নিজেরা যেমন শয়তানের ফাঁদে আক্রান্ত, যারা তার আশেপাশে থাকে তাদেরও শয়তানের ফাঁদে ফেলে দেয়। কাজেই একটু চুপচাপ থাকা যদি এত বড় ধরনের জটিলতার প্রতিবন্ধক হয় তাহলে চুপ থাকাই উচিত।
.
5️⃣ এমন কোনো সাজেশন দিতাম না যেটা রোগী ফলো করতে পারবে না। (একজন আমাকে বললো তাকে ৫ টা অডিও দেয়া হয়েছে। আমি মনে মনে বললাম, ভাভাগো!! আরেকজন বললো, তাতে ৮ ঘন্টা অডিও শুনতে বলা হয়েছে, আমি মনে মনে বললাম ওরে ভাভাগো!) প্রেসক্রিপশন লেখার আগে রোগীর হালত সম্পর্কে জানা উচিত সে কতক্ষন সময় দিতে পারবে সারাদিনের মধ্যে, কি করে না করে, ফ্যামিলি কতটা সাপোর্টিভ। তাছাড়া ৫ ঘন্টা অডীও শোনার চেয়ে আমার কাছে ১-১.৫ ঘন্টা তেলাওয়াত করা অনেক অনেক ভাল। যে তেলাওয়াত করতে পারে, তাকে কেন অডিও দিব! জিজ্ঞেস তো করা উচিত তেলাওয়াত করতে পারে কিনা। যার তেলাওয়াতে সমস্যা তার অডিও কম দিয়ে সাপ্লিমেন্টারিগুলোর দিকে নজর দেয়া উচিত বলে মনেকরি। সারাদিন ৪-৫ ঘন্টা যায় এমন পরামর্শ দিলে রোগী কয়েকদিন করে হাপিয়ে যাবে, বন্ধ করে দিবে। এরচে’ প্রাত্যহিক কাজকর্ম করতে পারে এমনভাবে পরামর্শ দেয়া উচিত। সাতদিনের জায়গায় একমাস লাগুক। অসুবিধাতো নেই। তবে কেউ যদি প্রতিদিন ৫-৮-১৫ ঘন্টা সময় দিতে পারে তাহলে তার কথা ভিন্ন।
.
6️⃣ স্বাভাবিক স্বাস্থ্যরীতি বিরুদ্ধ পরামর্শ না দেয়ার চেষ্টা করতাম। যেমন, পানি খাওয়া ভাল, কিন্তু বেশি খাওয়া ভাল না। পরিমিত খেতে হবে। এখন আমি যদি বলি সকালে উঠে খালি পেটে আট গ্লাস পানি খাবেন তাহলে সেটা সুস্থ মানুষের পক্ষেই কঠিন। আর অসুস্থ মানুষের কথা আর কি বলবো? তবুও বিপুল পানি ঘাটতিতে আছে এমন রোগীকে কোনো ডাক্তার খেতে বললে এক কথা। প্যারানরমাল সমস্যায় আক্রান্ত রোগীকে এমন পরামর্শ দিতাম না।
.
7️⃣ জ্বিনের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীকে রুকইয়াহ করার পর জরুরী যোগাযোগের নাম্বার দিতাম। প্রথমত, পরামর্শই এমনভাবে লেখার চেষ্টা করতাম যেন জ্বিন হাজির না হয়। এরপরও যদি হাজির হয়েই যায় তাহলে রোগীর অভিভাবক যেন যোগাযোগ করতে পারে সেজন্য যোগাযোগের নাম্বার দিতাম। কারণ, স্বাভাবিকভাবে এই বিষয়গুলোতে মানুষ ভীত হয়। জ্বিন হাজির হলে যদি আমার সাথে যোগাযোগ করতে না পারে, কি করবে নিজেও বুঝতে না পারে, তাহলে সম্ভবনা থেকে যায় যে আবার কবিরাজের কাছে দৌড় দিবে, কোথাও থেকে হুজুর ধরে নিয়ে এসে আবার তাবিজ লাগিয়ে দিবে। এর আগে যে মেহনত করা হয়েছে সেটা বিফল হবে।
.
8️⃣ এমন কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করতাম যাতে বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে যে, রোগীর ভরষা আল্লাহর উপর থেকে সরে আমার উপর চলে এসেছে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, রোগীকে সুস্থ করা আমার কাজ নয়। আমার কাজ হলে রোগীর সাথে আল্লাহর সম্পর্ক যেন মজবুত হয় সে চেষ্টা করা। আমি রুকইয়াহ করে দিলাম, সমস্যা চলে গেল। রোগীর দ্বীনি হালতের উন্নতি হল না। আবার আক্রান্ত হল, আবার আমার কাছে আসলো। এই চক্র চলতে থাকলে রোগীর মাইন্ডসেট এমন হতে পারে, আহমাদ রবীন ভাইতো আছেই। সমস্যা হলে তার কাছে যাব। আমি যা বুঝি, এটা অনেক অনেক বড় ক্ষতি হল। অনেকে তাবলীগ আর রুকইয়াহ আলাদা করে ফেলেন। কোনটা বড় মেহনত, কোনটা ছোট মেহনত ইত্যাদি ভাবতে থাকেন। আমি তাবলীগের মেহনত আর রুকইয়াহর মেহনতের মধ্যে বেসিক কোনো পার্থক্যতো দেখি না। দুই মেহনতেরই উদ্দেশ্য বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক মজবুত করা। কারও এর ব্যতিক্রম মনে হলে সেটা আমরা যারা রুকইয়াহ নিয়ে কাজ করছি, তাদের ব্যর্থতা।
.
9️⃣ সকল ধরনের রোগীকে সেলফ রুকইয়াহ করতে উৎসাহিত করতাম। নিজে নিজের রুকইয়াহ করার মত উপকার আর কিছুতে নেই। সমস্যা যখন আমার, আমারইতো আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সমাধান নেয়া দরকার। সেলফ রুকইয়াহ না করিয়ে একই রোগীকে প্রতিদিন রুকইয়াহ করার মত কাজ করতাম না।
.
1️⃣0️⃣ কম্পিউটার, প্রিন্টার রাখার চেষ্টা করতাম। প্রেসক্রিপশন প্রিন্ট করে দিতাম। বড় ডাক্তারদের মত ফাইল বানিয়ে দিতাম। ডিটক্স কিভাবে করে এর প্রিন্ট কপি রাখতাম, তাবিজ নষ্ট কিভাবে করে তার প্রিন্ট কপি রাখতাম। যার দরকার হত তাকে দিয়ে দিতাম। এইগুলো হাতে লিখে দেয়া সময় সাপেক্ষ, তাই না?
.
অনেক বেশি বুঝি? আপনার বিরুদ্ধে লিখেছি? না ভাই, আমার কাছে কিছু জিনিস লজিক্যাল মনে হয়নি। হয়ত আমার জ্ঞানের কমতি। দুআ’ করবেন, আল্লাহ যেন এই কমতি পূরণ করে দেন। আমীন।

Facebook Comments

Default Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

− এক = দুই