সোশ্যাল মিডিয়ায় অবিরত জিনের রুকইয়ার ঘটনা শেয়ার করা প্রসঙ্গে উন্মুক্ত চিঠি… | রুকইয়ার সমস্যা সমগ্র ৫

(এই স্ট্যাটাসের লেখাগুলো এক ভাইকে ব্যক্তিগতভাবে নসিহতের জন্য বলেছিলাম। এই প্রসঙ্গে আলাদা প্রবন্ধ লেখার চেয়ে সামান্য এডিট করে সবার জন্য প্রকাশ করছি। আশা করছি লেখক – পাঠক সবার জন্য এটা আখিরাতের পাথেয় হবে।)
——-

কেন রুকইয়ার ঘটনা খুব সতর্কতার সঙ্গে শেয়ার করা উচিত? কারণ –
১. এসব লেখাকে ভায়োলেন্সের প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে হিন্দু বা সেক্যুলাররা কাজে বাধা দেয়ার সুযোগ পাবে। তখন অন্যদের কাজের ক্ষেত্র নষ্ট হবে।
তান্ত্রিকরা ওদের পরিচিত এলিটদের দিয়ে ঝামেলা পাকাতে পারে। যেহেতু ওদের ইমারত ধ্বংস করতেসি আমরা।

২. এভাবে জ্বিনের ঘটনা শেয়ার করার কারনে রুকইয়ার ব্যাপারে মানুষের অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস বাড়ছে, আমাদের তো উচিত বিষয়টা সহজ ও স্বাভাবিক বানানোর চেষ্টা করা।
নইলে সুস্থতা পেতে দেরি হলে বা কোন কারনে তাৎক্ষণিক উপকার কম পেলে মানুষ বিষয়টার ওপরেই আস্থা হারিয়ে ফেলবে।
(এরকম ঘটনা ইদানীং ঘটছেও। ফেসবুকের গল্প পড়ে গিয়ে বিভিন্ন রাক্বিদের সাথে রোগীরা তর্ক করছে – “অমুক অমুক ভাই তো এত এত জিন হাজির করে ওয়াদা নিয়ে বিদায় করে, আপনি আমার বেলায় করছেন না কেন? কত টাকা দিলে করবেন?!!”
আগে যে কথা মানুষ কবিরাজদের রেফারেন্স টেনে বলত, আজ রাক্বিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছে। এটা আমাদের জন্য কষ্টের।)

৩. আপনি অনেক রোগীর রুকইয়া মাসের পর মাস করছেন, যেগুলোর আলোচনা পাবলিক প্লেসে আসেনি। কিন্তু মানুষ তো আপনাদের এসব স্ট্রাগল বুঝবে না।
আর আপনি শেয়ার করছেন ১০০ জন মানুষের ১০০টা কেস। এদিকে পাঠক কিন্তু ঘুরে ফিরে একই। এদের ওপর এতগুলা ঘটনার বিরাট ইফেক্ট পড়তেসে।
এজন্য আমি অনেককেই বলতাম দরকার না থাকলে রুকইয়াহ গ্রুপ আনফলো করে রাখেন, এত জনের অস্বাভাবিক ঘটনার পোস্ট যখন আপনি একা মানুষ পড়বেন। তখন খুব সহজেই আপনার ওপর এর মন্দ প্রভাব দেখা যাবে।
কারণ, চিকিৎসক হিসেবে একশ জনকে দেখা, আর এমনি পাঠক দর্শক হিসেবে দেখার কিন্তু পার্থক্য আছে।

৪. সার্বিকভাবে চিন্তা করে দেখেন, রেগুলার এসব স্ট্যাটাস দেয়াতে আদতে রুকইয়াহ ফিল্ডের জন্য ফায়দা হচ্ছেনা। উম্মাহর দীর্ঘমেয়াদি ফায়দা তো আরওই না।
আপনার ভালোভালো ঘটনা একসাথে করে একটা ডক বানালে বা ব্লগে রাখলে তখন ভিন্ন বিষয়, অল্প কজন যারা রুকইয়া নিয়ে কাজ করবে তারা বারবার পড়ে শিখতে পারবে।
কিন্তু শত শত সাধারন মানুষের কাছে পোস্ট করে দিলে এসব মানুষের মনে জীন-জাদু সম্পর্কে যেসব ফ্যান্টাসি আছে, সেগুলো আরো উসকে যাচ্ছে।
আর নিজের ওয়ালে দিতে চাইলে আমভাবে সবার জন্য শিক্ষনীয় ঘটনা একদম ফিল্টার করে দেয়া উচিত, সাথে এই ঘটনা থেকে কি বুঝা গেল, এটা কেন ইউনিক, এথেকে কি কি উপদেশ গ্রহণ করার আছে এগুলো উল্লেখ করে দেয়া উচিত।
নইলে দিন শেষে এগুলো পড়া আর ভুত এফএম বা রূপকথার গল্প পড়ার মাঝে খুব একটা ব্যবধান থাকবে না।
আবু ইবরাহিমের আলোচনাগুলো খেয়াল করলে এই জিনিসটা পাবেন, সে প্রতিটা ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শিক্ষণীয় বিষয় কি কি সেটা উল্লেখ করে দেয়।
রুকইয়াহ গ্রুপের ওয়েবসাইটে কিন্তু কেস স্ট্যাডি সেকশন আছে, কিন্তু পুরা খালি। সবরকম ঘটনা শেয়ার করলে সেটা অনেক আগেই ভরে যেত। আপনি/আপনারা চাইলে সেটা ব্যবহার করতে পারেন।
বেছে বেছে ঘটনা সেন্সর এবং সম্পাদনা করে সংরক্ষণ করলেন। ভবিষ্যতে যারা রুকইয়াহ নিয়ে কাজ করবে তাদের ফায়দা হবে।
হ্যা, লাভের লাভ একটা আছে কিছু লোকের! তা হচ্ছে, “এগুলা গল্প বা ভিডিও দিয়ে কাস্টমার ধরে।” এই কারণেই ওয়েস্টের বহু রাক্বি জায়েজ-নাজায়েজ বিবেচনা না করে, রোগীর প্রাইভেসির পাত্তা না দিয়ে ইউটিউবে রুকইয়ার অস্বাভাবিক অবস্থার ভিডিও আপলোড করতে থাকে। রোগীর অপ্রস্তুত অবস্থার ভিডিও আপলোড দিয়ে কাস্টমার ধরা নিসন্দেহে জঘন্যতম কাজগুলোর একটা।
যাহোক। শেষ কথা বলি –

৫. আপনিও একটা বিষয় জানেন, সেটা হলো “রাক্বিদের কাজ হল রুকইয়াহ আর মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। জ্বিনের সাথে বেশি কথা বলা ঠিক না। নাম, ধর্ম, কেন এসেছে। বিধর্মি হলে দাওয়াত দেয়া। এরপরে চলে যেতে বলা। গেলে ওয়াদা নেয়া আর না গেলে তাকে শাস্তির ভয় দেখানো” এটুকুই।
হ্যাঁ, অন্য কথা বললে রোগীকে করা যাদুর জিনিসপত্রের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা যায়। তবে পুরাপুরি বিশ্বাস করা যাবে না।
এসব কথার বাইরে বেশি কথা বললে কোরআনে বলা “জ্বিন থেকে ফায়দা নেয়ার দিকে” যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমরা শুরুর দিকে লোক হিসেবে আগুন কেন, ধুয়া থেকেও দূরে থাকব তাইনা? যেন ভবিষ্যতের জন্য উদাহরণ হতে পারি।
যেমন, বেন হালিমা শয়তান জিনের থেকে দাজ্জালের গল্প শুনে, ভালো জিন(!) ডেকে খারাপ জিন তাড়ায়। চিন্তা করেন অবস্থা…। (এমন শয়তানি পরামর্শও নতুন রাক্বি ভাইদেরকে কেউ কেউ ইনবক্সে পাঠাচ্ছে)
এগুলা বাদ, আপনার স্ট্যাটাসেই অনেকে বলছে জিনকে ওখানে পাঠান / এটা ওটা করতে বলেন। কেউ কেউ নিজের স্বপ্ন কিংবা হ্যালুসিনেশনের কথা এমনভাবে বলছে, যেন এটা যে এতে কোন সন্দেহের সুযোগ নাই। আপনি এসব স্বপ্ন কিংবা ভ্রমকে পাত্তা দিতে মানা করলে আপনাকেই মন্দ ভাবা শুরু করবে।
এভাবে তো শয়তান খেলার সুযোগ পাচ্ছে আমাদের নিয়ে।

কবিরাজদের ব্যাপারে একটা ফেমাস উক্তি হচ্ছে “ওরা ভাবে যে শয়তানকে বশ করে নিজের কাজ করাচ্ছে, আসলে শয়তানই ওদেরকে বশ করেছে।”
আমাদের ক্ষেত্রে যেন এমন সম্ভাবনা তৈরি না হয়।
অনেক কথা বললাম। একটু সতর্ক থাইকেন প্লিজ। প্রয়োজনে প্রতিটা লেখার পূর্বে আলেমদের সাথে মাশওয়ারা করেন, লাভ-ক্ষতি চিন্তা করেন, ইস্তিখারা করেন, এসব আমাদের পূর্বসূরিবড়দের অভ্যাস ছিল।
পরামর্শগুলো একটু সময় নিয়ে ভাববেন।
আল্লাহ আপনাকে ও আমাকে সবসময় কল্যাণের মাঝে রাখুক। আমিন।

Facebook Comments

Default Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

+ sixty one = sixty three