শাইখ খালিদ আল হিবশী কি ‘রুকইয়াহ এর সময় গাইর মাহরাম নারীকে স্পর্শ করা বৈধ’ বলেছেন?

এবং আরও কিছু কথা…

[ক]
প্রথমে আমরা একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, একমাত্র আমাদের নবী মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত কোন একক ব্যক্তিকে চোখ বুজে অনুসরণ করা কারও জন্য বৈধ নয়। সেটা যে কেউই হোক না কেন।

উদাহরণস্বরূপ: আমরা যারা ফিক্বহে হানাফি অনুসরণ করি, তারা শুধুমাত্র আবু হানিফা রহ. কে অনুসরণ করি না, বরং আবু হানিফা রহ. প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ফিকহী ধারা অনুসরণ করি, যা হাজার বছরের অসংখ্য আলেমদের অধ্যবসায়ের ফলাফল।
ইবনু তাইমিয়া রহ. তো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত কোন একক ব্যক্তির অনুসরণকে বৈধ বিশ্বাস করাকে ইরতিদাদ বলেছেন! অর্থাৎ এথেকে তওবা করতে বলা হবে, তওবা না করলে মৃত্যুদণ্ড।

যাহোক, এই কথাগুলো এজন্যই বললাম, কিছুদিন আগে এক রাকি (ধরে নিচ্ছি তার নাম ‘ফ’) উড়ো কথা ছড়িয়েছে, তা হল – আমরা নাকি সবসময় উস্তায তিম হাম্বলের কথাই ফলো করি, এর বাহিরে যাওয়াকে দোষারোপ করি।
আল্লাহ মাফ করুক। এটা স্পষ্ট অপবাদ। আমরা না এমনটা করি, না কখনও এমনটা দাবি করেছি, আর না এর কোন ভিত্তি আছে।

আমরা ইতিপূর্বে উস্তায তিল হাম্বলের যত প্রবন্ধ / লেকচার অনুবাদ করেছি, প্রতি ক্ষেত্রেই আমরা সেটার উৎসের সাথে মিলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি। আর আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কোন অংশ সম্পাদনার প্রয়োজন হলে সেটা করার পরেই প্রকাশের চেষ্টা করেছি। যদি আমরা অন্ধ অনুসারী হতাম তাহলে কখনও উনার কথার ওপর কলম লাগাতাম না।

যাহোক, অপর দিকে এক ভাই আমাকে বলেছেন, পূর্বোক্ত ‘ফ’ বলেছে “আমি যদি বলি শাইখ খালিদ হিবশিকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা বৈধ, তবে কথাটা ভুল হবে না।” (আল্লাহ মাফ করুক)

আসলে সেই ‘ফ’ লোকটি শাইখ খালিদ হিবশির নামে একটা হাইপ তৈরি করতে চাইছে, যেন সে রুকইয়ার নামে যত অপকর্ম প্রমোট করে সব শাইখ হিবশিরই নির্দেশনা!! (আল্লাহর পানাহ) মানযুর ভাই যখন তার প্রশংসা করে পোস্ট দিয়েছিল, সেখানেও এই শাইখ হিবশির কথাই বলেছিল।

মাত্র কদিন আগে, সেই লোক মেয়েদের স্পর্শ করা জায়েজ বলার সময় তার কথাবার্তার সাথে শাইখের বক্তব্য জুড়ে দিয়েছে, যেন শাইখও এটাই বলেছেন। অথচ শাইখের বক্তব্য এব্যাপারে আর দশজন আলেমের মতই। অর্থাৎ “একান্ত অপারগ না হলে বৈধ নয়। যদি মোটা আবরণ বা জড়বস্তু ব্যবহারে কাজ হয়ে যায়, তবে হাত দিয়ে স্পর্শ বৈধ নয়।”

[খ]
অবশ্য শরিয়তের দলিলকে খেলনা বানানো এই লোক আগেও এধরণের জালিয়াতি করেছিল, রোগীকে ইচ্ছামত মারধোরের পক্ষে লিখে এক মিসরি আলেমের প্রবন্ধের লিংক জুড়ে দিয়েছিল, যেন সেখানে তার পক্ষেই আলোচনা আছে। বাস্তবতা ছিল এর সম্পূর্ণ উল্টা!!

আরেকটা বিষয় হল, আমি জানিনা সে শাইখ খালিদ হিবশির ব্যাপারে কতটুকু জানে, তবে আমার নিজের ঘটনা হল – আমার নিজের কিছু সমস্যার জন্য একটা সময় পর্যন্ত ইমেইলে শাইখ হিবশির থেকে পরামর্শ নিয়ে নিয়ে রুকইয়া করেছি, শাইখ আমাকে কখনও কোন উল্টাপাল্টা কাজ করতে বলেননি।

[গ]
যাহোক, আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হল – শাইখ খালিদ আল হিবশী কি ‘রুকইয়াহ এর সময় গাইর মাহরাম নারীকে স্পর্শ করা বৈধ’ বলেছেন?
এবিষয়ে নিচের প্রবন্ধটি লিখেছেন শ্রদ্ধেয় ভাই আবু খুবাইব –


কোন কোন রাক্বী বলেন, ‘রুকইয়াহ এর সময় নারী রোগীকে স্পর্শ করা বৈধ৷ শাইখ খালিদ আল হিবশী বৈধ হবার ফতোয়া দিয়েছেন৷’ অথচ বাস্তবে শাইখের বক্তব্য ভিন্ন৷ জানি না, তাঁদের এমন ভুল ধারণা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে৷ আল্লাহ সবাইকে ফিতনাহ হতে হেফাজত করুন৷

আমরা শাইখের একটি ভিডিও বক্তব্য শেয়ার করছি, যেখানে তিনি নারী রোগীদেরকে স্পর্শ করার ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করেছেন৷ আশা করি এটা দেখার পর ভুল ধারণা দূর হবে৷

এই ভিডিওতে শাইখ খালিদ আল হিবশী গাইর মাহরাম নারীকে স্পর্শ করার ব্যাপারে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছেন:

১. রুকইয়াহ এর বিধান চিকিৎসার বিধানের মত। যতটুকু স্পর্শ করা আবশ্যক কেবল ততটুকুই করতে পারবে। যদি কোন বিকল্প পদ্ধতি থাকে, যেমন লাঠি বা কোন যন্ত্রের সাহায্যে স্পর্শ করা, তবে বিকল্প পদ্ধতিই প্রয়োগ করতে হবে৷

২. নারী রোগীর রুকইয়াহ করা বৈধ, তবে কোন শরীরের কোন স্থানে স্পর্শ করা ব্যতিত। (শুনুন: 1:00-1:10)

৩. যদি কখনো স্পর্শ করা আবশ্যক হয়ে যায় তখন আবরণের ওপর থেকে স্পর্শ করবে৷ সেক্ষেত্রেও মাথার ওপর স্পর্শ করার বিধান আর বুক বা অন্য কোন স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করার বিধান এক না।

৪. কোন নির্দিষ্ট স্থানে স্পর্শ করা বা চাপ দেয়ার প্রয়োজন হলে মেসওয়াক বা অন্য কিছু দ্বারা স্পর্শ করবে। অথবা একটা বালিশের ওপর থেকে স্পর্শ করবে।

৫. কেবল জরুরতের সময়ই স্পর্শ করা যেতে পারে৷ যেসব ক্ষেত্রে রোগীকে স্পর্শ করা আবশ্যক হতে পারে তার কয়েকটি উদাহরণ:

ক. রোগী রাকীকে আক্রমণ করেছেন। রোগীর মাহরামরা ভয়ে পালিয়ে গেছেন।

খ. রোগী শরীরের কাপড় খুলে ফেলছেন। বাঁধা না দিলে বিবস্ত্র হয়ে যেতে পারেন। মাহরামরা ভয়ে পালিয়ে গেছেন।

গ. রোগী আত্মহত্যা করার চেষ্টা করছেন। মাহরামরা ঠেকাতে পারছেন না।

এ ধরণের ক্ষেত্রে রাকীর বিধান উদ্ধারকর্মীদের মতই৷ এটা জরুরত৷

কিন্তু যে এসে বলে, ‘আমি ডাক্তারের মতই’, তারপর বিভিন্ন স্থানে হাত রাখে, তার ব্যাপারটি এমন না৷ (অর্থাৎ, বৈধ না৷) (2:36-2:40)

শাইখ খালিদ আল হিবশী এ ব্যাপারে ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ এর ফতোয়া উল্লেখ করেছেন। ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “গাইর মাহরাম নারীর রুকইয়াহ করার সময় তাকে স্পর্শ করা বৈধ নয়। কারণ, এখানে কোন জরুরত নেই। তবু যদি ধরে নেয়া হয় যে কখনো জরুরত হয়, তবে সেক্ষেত্রে স্পর্শ করা বৈধ৷ তবে শর্ত হল, স্পর্শ করার সময় কামনা জাগ্রত হওয়ার আশংকা থাকবে না৷ অন্যথায় তা হারাম হবে৷”

সবশেষে তিনি একটা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য হুবহু তুলে ধরছি:

بخلاف ما نسمعه من بعض من دخلوا في هذا الباب، يقول: ‘أنا مثل الطبيب’، ويتحسس، ويقوم بأمور، ما لها…
يعني – أعوذ بالله من الشيطان الرجيم – يزني بيده ويزني ببصره.

“এই কাজে জড়িত কারো কারো ব্যাপারে আমরা যা শুনতে পাই তাদের ব্যাপারটি ভিন্ন। (অর্থাৎ অবৈধ।) সে বলে, ‘আমি ডাক্তারের মতই’। তারপর সে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এবং এমন কিছু কাজ করে যা…
অর্থাৎ, – বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় চাই – সে হাত ও চোখ দ্বারা যিনা করে।”

[উল্লেখ্য, কেউ যদি দাবি করেন, অনুবাদে ভুল হয়েছে, তাহলে দয়া করে ভুলটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন। আমরা সংশোধন করতে প্রস্তুত।]


শাইখের বক্তব্যের ইউটিউব লিংক এবং আমাদের এবিষয়ের আলোচনা কমেন্টে দেয়া হল। সত্যানুরাগী পাঠকরাই মিলিয়ে নেবেন কারা আমানত রক্ষা করেছে, আর কারা দ্বীনকে নিয়ে খেলছে।

আল্লাহ আমাদের হিদায়াতের ওপর অবিচল রাখুক। আমিন।

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventy six + = 85