জ্বিনের আসর বিষয়ে ইসলাম আক্বীদা

বিসমিল্লাহ্‌!

যাদু, জ্বিন ও বদনজর সিরিজের দ্বিতীয় অধ্যায় আজ শুরু হচ্ছে। সিরিজের নাম শুধু “জ্বিন” দিলাম না এজন্য.. কারণ এটা ব্যাপক অর্থবোধক, জ্বিন সিরিজ বললে এর মাঝে জ্বিন জাতির ইতিহাস, প্রকার, গোত্র, জীবনাচার অনেক কিছু আলোচনা আবশ্যক হয়ে পড়ে, অথচ এতে আমরা শুধু খারাপ জ্বিনদের বিভিন্ন প্রকার ক্ষতি থেকে বাঁচার ইসলাম সম্মত নিয়ে আলোচনা করবো। আল্লাহ্‌ আমাদের সহায় হোক।

আজ আমরা ‘জ্বিন মানুষের ক্ষতি করতে পারে কিনা’ এবিষয়ে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বিদা জানবো। এপ্রসঙ্গে সহীহ আকিদার সারকথা হচ্ছে- “জ্বিন মানুষের ক্ষতি করতে পারে, বিভিন্নভাবে কষ্ট দিতে পারে, অসুস্থ করে দিতে পারে, এমনকি সম্পূর্ণ পাগলও বানিয়ে দিতে পারে!”

চলুন হাদিস থেকে আমরা কয়েকটি উদাহরণ দেখে নেই।

প্রথম হাদিসটি আবু ইয়া’লা ইবনে মুররা থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. এর সাথে এক সফরের ঘটনা, যাতে সাহাবায়ে কিরাম রা. অনেকগুলো আশ্চর্য বিষয় দেখেছিলেন। তাঁর মাঝে একটি হচ্ছে-

“….আমরা পথিমধ্যে এক মহিলাকে দেখতে পেলাম, তার সাথে একটা শিশু ছিলো। মহিলা রাসূল সা. এর কাছে এসে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার ছেলেটা খুব বিপদে আছে, আমরাও একে নিয়ে বিপদে আছি! দৈনিক কয়েকবার একে জ্বিনে ধরে..!!

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বাচ্চাটাকে এদিকে নিয়ে আসো.. এরপর রাসুল সা. বাচ্চাটার মুখ হা করে ধরে, “উখরুজ আদুওয়াল্লাহ, আনা রাসুলুল্লাহ!” (হে আল্লাহর দুষমন বের হ! আমি আল্লাহর রাসুল) বলে ওর মুখে ফু দিলেন, এরকম তিনবার করলেন। এরপর মহিলাকে বললেন, আচ্ছা একে নিয়ে যাও, ফেরার পথে যখন আমরা এদিক দিয়ে যাবো, তখন আরেকবার দেখা করো..

অতঃপর আমরা সফর থেকে ফেরার সময় ওই মহিলাকে আবার পেলাম, রাসুল সা. জিজ্ঞেস করলেন- তোমার ছেলের কী অবস্থা? মহিলা বললো, যে আল্লাহ আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তার শপথ! সেদিনের পর থেকে আমার ছেলে খুব ভালো আছে, কোনো সমস্যা হয়নি। মহিলার সাথে তিনটা ভেড়া ছিল, সেগুলো রাসুল সা.কে দিতে চাইলো। রাসুল সা. কোনো সাহাবাকে বললেন, একটা নাও.. বাকিগুলো ফিরিয়ে দাও…

হায়সামি রহ. বলেন, ইমাম আহমাদ রহ. দুটি সহিহ সনদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন (মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৯/৪ দ্রঃ) এছাড়াও শব্দের সামান্য কম বেশিসহ এই হাদিসটা অনেক প্রসিদ্ধ হাদিসের কিতাবে এসেছে, যেমন- তাবারানী, দারিমী, আবু দাউদ। মুসতাদরাকে হাকেমে এটাকে সহিহ বলা হয়েছে, এবং ইমাম যাহাবি সমর্থন করেছেন। (২/৬১৭ দ্রঃ)

এছাড়া রাসুল সা. এর জামানার বেশ কয়েকটি জ্বিন ছাড়ানোর ঘটনা আছে, আমরা তার মাঝে এক দুইটা খেয়াল করি।

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন, গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা অভিযানে আমরা রাসূল সা. এর সাথে ছিলাম, এক মহিলা তার বাচ্চাকে নিয়ে এসে বললো ইয়া রাসুলুল্লাহ শয়তান এর ওপর ভর করেছে। রাসুল সা. বাচ্চাটাকে একদম কাছে নিয়ে আসলেন, এরপর “উখরুজ আদুওয়াল্লাহ, আনা রাসুলুল্লাহ!” বলে ছেলেটার মুখে ফু দিলেন তিনবার, তারপর বললেন, যাও এর আর কোনো সমস্যা নাই। (মুজামুল আওসাত, মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা আছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত একটা ঘটনা এরকম, এক মহিলা তার বাচ্চাকে নিয়ে এসে বললো ইয়া রাসুলুল্লাহ সকাল বিকেলে একে পাগলামী ধরে, আমাদের জীবন অঅতিষ্ঠ করে ফেলছে। রাসুল সা. বুকে হাত বুলালেন (আরেক ঘটনায় আছে বাচ্চাটার পিঠে তিনটা থাপ্পড় দিলেন) আর বললেন “উখরুজ আদুওয়াল্লাহ, আনা রাসুলুল্লাহ!” পরে ছেলেটা বমি করলো, বমির সাথে কুকুরের বাচ্চার মত কিছু একটা বের হয়ে দৌড় দিলো। (সেটা জিন ছিলো..) [এর সনদ হাসান]

এই দুটি ঘটনা মুসনাদে আহমাদ, দারিমী, তাবারানী, দালায়েলুন নাবুওয়াহ এসব হাদিসগ্রন্থে পাওয়া যাবে।
হাদিসগুলোর তাহকিক এখানে দেখুন- http://fatwa.islamweb.net/fatwa/index.php…

কোরআনের একটি আয়াত দিয়ে আলাপ শেষ করা যাক।উলামায়ে কিরাম এপ্রসঙ্গে নিম্নের আয়াতটিও পেশ করে থাকেন-

الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ 

অর্থঃ “যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে এমনভাবে দন্ডায়মান হবে, যেন তাদেরকে শয়তান আসর করে পাগল বানিয়ে দিয়েছে।” (সুরা বাক্বারা, আয়াত ২৭৫)

এই আয়াত থেকে অন্তত দুইটি বিষয় বুঝা যায়- এক. খারাপ জিন মানুষকে আসর করতে পারে.. দুই. জিনের আসরের কারনে মানুষ অসুস্থ এমনকি পাগল হয়ে যেতে পারে। [মারিফুল কোরআন (পূর্ণাঙ্গ এডিশন) ১ম খন্ড ৬১১পৃ. দ্রষ্টব্য]

ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন- মানুষকে জ্বিন আসর করতে পারে, এটা যারা অস্বীকার করে তাদের ভ্রান্তির বিরুদ্ধে এই আয়াতটি দলিল। (তাফসিরে কুরতুবি এই আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য)

রাসুলের জামানার একটা ঘটনা (আবু দাউদ শরিফে) আছে, একজন জিনের আসরে পাগল হয়ে গিয়েছিলো, ভালো হচ্ছিলো না। তাকে শেকল দিয়ে বেধে রাখা হতো। একজন সাহাবী সুরা ফাতিহা পড়ে কয়েকদিন রুকইয়া করলে সে সুস্থ হয়ে যায়, পরে ওই সাহাবী রাসুল সা. এর কাছে এসে ঘটনা শোনায়। তখন কোরআন দ্বারা ঝাড়ফুঁক করার কারণে রাসুল সা. সাহাবীর প্রশংসা করেন।

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 − seventy three =