বিয়ে নিয়ে যত কথা

লিখেছেনঃ উম্মে আব্দুল্লাহ

 বর্তমান সময়ে আলোচিত কিছু সমস্যার মধ্যে একটা হচ্ছে বিয়ে বন্ধ। বেশিরভাগ আপুরই একটা কমন অভিযোগঃ

১.আমার বয়স এত হয়ে গেছে। কিন্তু বিয়ে হচ্ছেনা। আগে প্রস্তাব যা আসতো এখন তাও আসেনা। আমল দেন আপু।
২.আপু আমার বিয়ে আসে কিন্তু কথা আগায় না। অমুক হুজুর, অমুক কবিরাজের কাছে গিয়েছিলাম উনারা বলছেন বিয়ে আটকে রাখছে। যাদু নষ্টের আমল দেন।
৩.এত আমল করছি তবুও বিয়ে হচ্ছেনা আপু কি করবো??
৪.আপু একজনকে খুব ভালোবাসি। তাকে কাছে পাওয়ার আমল দেন প্লিজ। কিংবা কাউকে নির্দিষ্ট করে চাওয়া যাবে কি?

উত্তরঃ

(১) বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আপুরা পড়াশুনা শেষ করে কিছু একটা করবে এই আশায় সময়মত বিয়ে করেন না। বয়স তুলনামূলক বেশি হয়ে যায়। যার ফলে পরবর্তিতে আর উনাদের উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাওয়া যায়না। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন হয়ে গেছে যে এখানে সঠিকসময়ে মেয়ে বিয়ে দেয়াকে বাল্য বিবাহ বলা হয়। অন্যদিকে বাবা-মাও তাদের মেয়েকে স্বাবলম্বী করার জন্য পড়াশুনা করাতে করাতে মেয়ের বয়সের কথাটা ভুলেই যান। ফলাফল…
বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও মেয়ের বিয়ে হয়না। আব্দুল্লাহর বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজতে গিয়ে অভিজ্ঞতা হয়েছে বেশ। ১৮/১৯/২১ বছরের মেয়েদেরও নাকি বিয়ের বয়স হয়নি। আরো ২/৪ বছর যাক মেয়ে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করুক তারপর ভেবে দেখবে। যাই হোক, সঠিক সময়ে সঠিক কাজ না করলে একটু ভোগান্তিতে তো ভুগতেই হবে। তাই হতাশ না হয়ে বেশি বেশি এস্তেগফার পড়ুন আর দু’আ করতে থাকুন।

(২) বর্তমান সময়ে শিরক, কুফর মহামারী আকার ধারন করেছে। এবং এইগুলা এত সহজলভ্য হয়ে গেছে যে, ভাত রান্না করার চেয়েও কুফরি করার সহজ! (নাউযুবিল্লাহ) এর কারণে এসব দ্বারা অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা খুবই বেড়ে গেছে। তাই যাদু করে বিয়ে বন্ধ করা অস্বাভাবিক কিছু না। আর এইটা নিয়ে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। যাদু কাটানোর জন্য ঠিকঠাক রুকইয়া করলে যাদু কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ। আর যাদু কাটতে কতটা সময় লাগবে তা নির্ভর করবে আপনার নিয়্যাত, ইয়াক্বীন আর মেহনতের উপর। দয়া করে এ নিয়ে বারবার প্রশ্ন করবেন না।

আর হ্যাঁ! এর জন্য কোন কবিরাজের কাছে যাবেন না । কারন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উনারা কুফরি কালাম দিয়ে কুফুরি কাটেন। তাই জেনেশুনে নিজের ঈমান নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। কবিরাজদের থেকে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখুন। আরেকটা ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, যাদু-টোনার সমস্যা না থাকলেও অনেকে দ্রুত বিয়ে হওয়ার জন্য কবিরাজের শরণাপন্ন হন। যেখানে তারা আমল হিসেবে কিছু আউলা-বাউলা কথা শিখিয়ে দেন বা তাবিজ দেন। যা কোনভাবেই শরিয়াহসম্মত না।

তাই আবারো বলছি জেনেশুনে নিজের ঈমানকে হুমকির মুখে ফেলবেন না প্লিজ। আর বিয়ে হচ্ছেনা মানেই যে আপনাকে যাদু করা হয়েছে সবসময় এমনটাও ভাবা বোকামি। সবকিছুরই তো নির্দিষ্ট একটা সময় আছে। আর কিসে বা কখন বান্দার জন্য কোনটা উপযুক্ত তা আল্লাহ তা’আলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। শুধু দরকার একটু সবর আর দু’আ।

তবে যাদুর সব লক্ষণ যদি মিলে যায় তাহলে আপনি বিয়ে বন্ধের রুকইয়া করতে পারেন। তবে আমি সবসময় একটা কথা বলি যেকোন রুকইয়া শুরুর আগে আগে সাতদিন বদনজরের রুকইয়া করে নেয়া উত্তম। এতে পরের রুকইয়া ভালো ইফেক্ট ফেলে আলহামদুলিল্লাহ।

(৩) প্রথম কথা হচ্ছে আমাদের এটা ভুলে গেলে চলবেনা যে আল্লাহ তা’আলার হুকুম ব্যাতিত কোন কিছুই ঘটেনা। আর তিনি যা করেন বা করবেন তা আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেন বা করবেন। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে আপনার উপর বিপদ আপতিত হয়েছে। আপনি অনেক কষ্টে আছেন। এতে ভালো কিছু চোখে পড়ছেনা। হতাশায় ভুগছেন কেন এমন হলো। পরবর্তিতে দেখবেন যে এইটা আপনার জন্য কল্যাণকর প্রমাণ হবে। আর যদি দুনিয়াতে এমন কিছু আপনার চোখে না পড়ে, তাহলে বুঝবেন রব্বুল আ’লামীন আপনাকে আখিরাতে এর উত্তম প্রতিদান দিবেন। কারন তিনি তাঁর বান্দাকে কখনো বঞ্চিত করবেন না। তাই হতাশ হবার কিছু নেই। তাঁর উপর, তাঁর ফয়সালার উপর আস্থা রাখুন। দেখবেন সব কিছু সহজ হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ। এ তো গেলো ইয়াক্বীনের কথা। এবার বলি আমলের কথা।

যেকোন আমল, দু’আ কবুলের পুর্বশর্ত হচ্ছে সকল প্রকার গুনাহ থেকে বাঁচা। আর পুর্বেকৃত গুনাহর জন্য ইস্তেগফার করা। অথচ আমাদের অবস্থা এমন আমরা গুনাহ করছি সাথে আমলও করছি। তাহলে আমাদের আমল কাজে লাগবে কিভাবে বলতে পারেন? আপনি ফরজ ইবাদাত বাদ দিয়ে শুধু নফল ইবাদাত করছেন, আর চাইছেন আর বলছেন এত চাইছি তাও হচ্ছেনা। একটু ভেবে দেখেন তো, সত্যিই কি আপনি চাওয়ার মত চেয়েছেন?

অনেক আপু বলেন- আপু আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, তাহাজ্জুদও পড়ি। আর কি করবো? তাদের বলবো, আপু বেশি কিছু না আপনি লাইব্রেরী থেকে একটা “আহকামুন নিসা” কিনে ফেলেন। এরপর মিলিয়ে দেখুন আপনার আর কি করা উচিত। আর যা করছেন তা ঠিকমত হচ্ছে কিনা। আর একটা কথা আপনি নামাজ কাযা করছেন না কারন এর জন্য আপনাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু একই সাথে আপনি পর্দা সম্পর্কে গাফেল। “পর্দা> যে ফরজের কোন কাযা নেই”। আপনি বেপর্দা হয়ে যত মুহুর্ত কাটাবেন তত মুহুর্তের জন্য আপনাকে হিসেব দিতে হবে। ফিরে আসুন আপু। এখনও সময় আছে।

আচ্ছা এইবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনিই সত্যিই কি আল্লাহকে ডাকার মত ডাকছেন?

(৪) বিয়ের জন্য কাউকে নির্দিষ্ট করে চাওয়া উচিত নয়। আমাদের জন্য কি উত্তম, কে উত্তম তা আল্লাহ ব্যতিত কেউ বলতে পারবে না। তাই আল্লাহর কাছে উত্তম কিছুর জন্য দু’আ করুন। এ প্রসঙ্গে আমার এক বান্ধবীর কথা বলি। ওর বিয়ের সাত বছর চলছে। এই সাত বছরে ও সাতদিনও বোধহয় সুখে সংসার করতে পারেনি। ও শুধু এখন বলে কেন যে ওকে এত জোর করে চাইছিলাম। কত দু’আ যে করছি ওকে পাওয়ার জন্য। এখন শুধু আফসোস লাগে। মনে হয় তখন যদি এমন করে না চাইতাম। যদি আল্লাহ তা’আলার উপর ছেড়ে দিতাম। এ তো পাওয়ার কথা। এইবার বলি না পাওয়ার কথা।

সেদিন এক আপু বলছিলেন একজনকে খুব করে চেয়েছিলাম কিন্তু পাইনি। খুব আফসোস হতো সেজন্য। কিন্তু এখন বুঝি আল্লাহ তা’আলা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

কারন একমাত্র তিনিই জানেন কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। এ সম্পর্কে কুর’আনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা এমন অনেক কিছুকে অপছন্দ কর, অথচ সেটা তোমার জন্য ভালো। আবার অনেক কিছুকে তোমরা পছন্দ করো, অথচ সেটা তোমাদের জন্য খারাপ।” (সূরা বাকারা:২১৬)

তবে যেহেতু আমাদের কর্তব্য হলো তাকদীরে বিশ্বাস করা, আর আমল করা। সে হিসেবে আমরা এখন বিয়ের জন্য আমল ও অজিফার কথা জানবো এবং তদানুযায়ী আমল করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করুন সাথে নিয়মিত তাহাজ্জুদ ও সালাতুল হাজত পড়ে দু’আ করুন। তাঁর কাছে সাহায্য চান।

২. বেশি বেশি এস্তেগফার করুন। আর এস্তেগফার হচ্ছে এমন এক আমল যার উছিলায় আল্লাহ তা’আলা রিজিক, সম্পদ, সন্তান-সন্ততিতে প্রশস্ততা দান করেন।

৩. নিম্নোক্ত দুয়াটি বেশি বেশি পাঠ করবেন। উঠা-বসা, চলা-ফেরা যেকোন সময়েই পড়তে পারেন।

رب إني لما أنزلت إلي من خير فقير

রব্বি ইন্নি..লিমা.. আং..ঝালতা ইলাইয়্যা মিন খইরিং.. ফাক্বি..র।
অর্থ : হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যেই কল্যাণই নাযিল করবেন আমি সেটারই মুখাপেক্ষী।

৪. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর সূরা ফুরকানের ৭৪ নং আয়াত পড়বেন।

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوٰجِنَا وَذُرِّيّٰتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

রব্বানা..হাব লানা..মিন আঝওয়াজিনা..ওয়া যু’র্রিয়্যা..তিনা..ক্বুর্রতা আঅ’য়ুনিউ..ওয়াজআ’লনা..লিলমুত্তাক্বিনা ইমা..মা..।
অর্থ: হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী/স্বামী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।

৫.  ﻳﺎﻓﺘﺎﺡ , ( ইয়া ফাত্তাহু)প্রতিদিন ফজরের পর বাম হাতের উপর ডাম হাত রেখে আল্লাহর এই নামটি ৪০ বার পড়বেন। এভাবে ৪০ দিন পড়লে ইনশাআল্লাহ ফল পাওয়া যাবে।

এই আমলগুলোর প্রভাব আলহামদুলিল্লাহ আমি নিজে দেখেছি। তাই শেয়ার করলাম। বাকি অন্য আপুরা আরো কিছু জানলে শেয়ার করতে পারেন।

আর হ্যাঁ আগেই বলেছি যেকোন আমল বা দু’আ কবুলের পুর্বশর্ত হচ্ছে গুনাহ থেকে বাঁচা। তাই সকল প্রকার গুনাহ বাঁচুন। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করুন।হারাম থেকে বাঁচুন। পর্দার মধ্যে থাকুন। আর রহমানুর রাহীমের দয়ার প্রতি ভরসা রাখুন। হতাশ হবেন না। আর যেসব আপুরা রুকইয়া করতে চাচ্ছেন উনারা আব্দুল্লাহর যাদু নিয়ে লিখাটা পড়ে নিতে পারেন। আর রুকইয়া সংক্রান্ত তথ্য বা সাহায্যের জন্য রুকইয়া সাপোর্ট গ্রুপে যোগাযোগ করুন। আরেকটা কথা আপনারা সবাই জানেন কেউ যদি সরাসরি রুকইয়া করাতে চান সেক্ষেত্রে পর্দা আবশ্যক। বেপর্দা হয়ে আসলে রুকিয়া করা হয়না। তাহলে সেলফ রুকইয়া করার জন্য কি এই নিয়ম কোনই গুরুত্ব বহন করেনা?

রব্বুল আ’লামীন আমাদের সকলকে সঠিকভাবে আমল করার তৌফিক ও সঠিক বুঝ দান করুন।। (আমীন)

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− three = 4