রুকইয়ার শরঈ বিধান এবং বদনজরের চিকিৎসা

[ক]

গত তিন পর্বে আশা করছি বদনজর বিষয়ে আপনাদের কোনো অস্পষ্টতা নেই। এরপরেও যদি থাকে তাহলে কমেন্টে সুওয়াল করতে পারেন। ইনশাআল্লাহ উত্তর দেয়া হবে।

এপর্বের শুরুতে রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁক বিষয়ে ইসলামের বিধানটা ক্লিয়ার করি, এরপর বদনজর আক্রান্তের চিকিৎসা বলা হবে। তবে অনেকগুলো অপশন দেখে কনফিউশনে ভুগলে বলবো [ঘ:পঞ্চম পদ্ধতি] ফলো করুন।
জ্বিন বা যাদুর মত নজরের চিকিৎসায় বিশেষ কোনো ঝামেলা নাই, এটা বেশ সহজ, অতএব আল্লাহর নামে পড়তে থাকুন।

[খ]
আচ্ছা রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে উলামাদের মতামতের সারকথা হচ্ছে- যদি ঝাড়ফুঁকে শিরকি কিছু না থাকে তাহলে সেটা বৈধ হবে। এক্ষেত্রে সতর্কতাবশত কোরআন এর আয়াত অথবা দু’আয়ে মাসুর (যা হাদিস বা আসারে সাহাবায় আছে) এসব দ্বারা করা উত্তম।

দলিল হিসেবে একটি হাদিস উল্লেখ করি, হাদিসটি মুসলিম শরিফের।

“আওফ ইবনু মালিক আশজাঈ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাহেলী যুগে বিভিন্ন মন্ত্র দিয়ে ঝাড়-ফুঁক করতাম। তাই আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আরয করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এব্যাপারে আপনার কি অভিমত? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার কাছে পেশ করতে থাকবে, যদি তাতে শিরক না থাকে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ইফাঃ ৫৫৪৪, ইসলাম ওয়েব ২২০০)

এটা হলো ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে ইসলামের বিধান, যে রাসুল সা. জাহেলি যুগের মন্ত্র দিয়েও ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দিয়েছেন যদি তাতে শিরক না থাকে। উপরন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় তথা বদনজর এর জন্য ঝাড়ফুঁক করার ব্যাপারে বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী সহ প্রায় হাদীসের কিতাবেই একাধিক হাদিস আছে। অনেক কিতাবে যেমন সহীহ মুসলিমে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায়-ই আছে বদনজরের জন্য রুকয়া করা নিয়ে। আমরা শুধু একটা হাদিস দেখে নেই-

“আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বদ নযর এর জন্য রুকইয়াহ (ঝাড়-ফুঁক) করার হুকুম করতেন।” (সহীহ মুসলিম, ৫৫৩২, ৫৫৩৩, ৫৫৩৪)

[গ]
এবার বদনজরে চিকিৎসা জেনে নিন।

প্রথম পদ্ধতিঃ যদি জানা যায় কার নজর লেগেছে তাহলে আমির ইবনে রাবি’আ এবং সাহল ইবনে হুনাইফ রা. এর হাদিস এর ব্যাপারটা অনুসরণ করলেই হবে। অর্থাৎ যার নজর লেগেছে তাকে অযু করতে বলবে, অযুর পানিগুলো একটা পাত্রে জমা করবে এরপর আক্রান্ত ব্যাক্তির গায়ে ঢেলে দিবে। নোটঃ এই পদ্ধতি সকলের জন্য। 

সুওয়ালঃ কুলি করার পানিও কি জমা করবে?
উত্তরঃ যদিওবা এক হাদিসে আছে কুলির কথা, তবে না নিলেও সমস্যা নেই। এমনকি অধিকাংশের ক্ষেত্রে শুধু হাতমুখ ধোয়া পানি নিয়ে অপরজন হাত মুখ ধুলেই বদনজর নষ্ট হয়ে যায়।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ রোগীর মাথায় হাত রেখে এই দুয়া গুলো পড়বে, পড়া শেষে রোগীর গায়ে ফুঁ দিবে.. এরকম কয়েকবার করবে। নোটঃ বাচ্চাদের জন্য এই পদ্ধতি ফলো করা যেতে পারে।

১.
أُعِيْذُكُمْ بِكَلِمَاتِ اللّٰهِ التَّامَّةِ ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উ”ঈযুকুম বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মাহ। মিং কুল্লি শাইত্বা-নিও- ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিং কুল্লি “আঈনিল্লা-ম্মাহ।
২.
بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
বিসমিল্লা-হি আরকীক। মিং কুল্লি শাইয়িই ইউ’যীক। মিং শাররি কুল্লি নাফসিন আও “আইনি হাসিদ। আল্লা-হু ইয়াশফীক। বিসমিল্লা-হি আরকীক।
৩.
بِاسْمِ اللَّهِ يُبْرِيكَ، وَمِنْ كُلِّ دَاءٍ يَشْفِيكَ، وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ، وَشَرِّ كُلِّ ذِي عَيْنٍ
বিসমিল্লা-হি ইউবরীক। ওয়ামিং কুল্লি দা-ঈই ইয়াশফীক। ওয়ামিং শাররি হাসিদিন ইযা- হাসাদ। ওয়া শাররি কুল্লি যী “আঈন ।
৪.
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبْ الْبَاسَ، اشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
আল্লা-হুম্মা রাব্বান না-স। আযহিবিল বা’স । ইশফি ওয়াআংতাশ শা-ফী। লা-শিফাআ ইল্লা-শিফাউক। শিফাআল লা-ইউগা-দিরু সাক্বামা-।

উপরের দোয়াগুলোর ছবি

এরপর চাইলে সাথে ৩ বার অথবা ৭ বার করে করে সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুুুরসি, ইখলাস, ফালাক, নাস পড়বেন এরপর সেখানে ফুঁ দিবেন।

সমস্যা বেশি হলে উল্লেখিত পদ্ধতিতে রুকইয়া করা শেষে, আরেকবার এগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে খাবেন এবং গোসল করবেন। সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন করবেন এই দুটো কাজ করা উচিত। এছাড়া কোন অঙ্গে ব্যাথা থাকলে এসব দোয়া-কালাম পড়ে তেলে ফুঁ দিয়ে প্রতিদিন মালিশ করতে পারেন।

বদনজর আক্রান্ত কারো কারো ওপর রুকইয়া করতে চাইলে এই পদ্ধতিটা অনুসরণ করা উচিত। অনুরূপভাবে ছোট বাচ্চাদের বিবিধ সমস্যা / রোগবালাইয়ের জন্য রুকইয়া করতে চাইলেও এটা অনুসরণ করা যায়।

আর হ্যাঁ! উল্লেখিত সবগুলো দোয়া রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদিস থেকে নেয়া।

তৃতীয় পদ্ধতিঃ যদি কোনো গাছ, গৃহপালিত পশু, দোকান অথবা বাড়িতে নজর লাগে তাহলে উপরের সুরা এবং তার ওপরের দু’আগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিবেন, এরপর ওই পানিটা (গাছে/ঘরে/পশুর গায়ে) ছিটিয়ে দিবেন।

[ঘ] চতুর্থ পদ্ধতিঃ

বদনজরের জন্য সেলফ রুকইয়া –

যদি না জানা যায় আপনাকে কার নজর লেগেছে, অথবা অনেক দিনের সমস্যা হয়, কিংবা যদি অনেকজনের নজর লাগে, তাহলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। আমার পরিচিতদের সমস্যা হলে আমি এভাবে রুকইয়া করতে সাজেস্ট করি। আর বদনজরের জন্য নিজে নিজে রুকইয়া করতে চাইলে এই পদ্ধতিই সাজেসটেড।

নিয়ম হচ্ছে-

1. রুকইয়া শারইয়্যার আয়াতগুলো সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন তিলাওয়াত করবেন অথবা শুনবেন, সরাসরি শোনা সম্ভব না হলে অডিও রেকর্ড শুনবেন। এভাবে প্রতিদিন কমপক্ষে ১/২বার পুরো রুকইয়া শুনুন, আরও বেশি শুনলে বেশি ফায়দা। 

অডিও শুনতে চাইলে সাজেস্ট করব প্রথমটি অর্থাৎ “বদনজর (Evil Eye)” এরটা শুনুন। এটাই রিকোমেনডেড। এছাড়া সা’দ আল গামিদীর আধাঘণ্টার রুকয়াটাও শুনতে পারেন। (ডাউনলোড লিংক – ruqyahbd.org/download)
যদি আপনার কোনো সমস্যা থাকে তাহলে আপনি ফিজিক্যালি এর প্রভাব টের পাবেন। যেমনঃ প্রচণ্ড ঘুম আসবে, মাথাব্যথা করতে পারে, হাত-পা কামড়াতে পারে, শরীর ঘামতে পারে, বেশি বেশি প্রসাব হতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে এরপরেও শুনতে থাকবেন, ঘুম আসলে চেষ্টা করবেন জেগে থাকতে। আর সমস্যা সমাধান হলেই ভালো ফিল করতে লাগবেন.. ইনশাআল্লাহ! দুশ্চিন্তার কারণ নাই…
আর কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে শোনার পরেও যদি কোনোই ইফেক্ট না বুঝতে পারেন, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ্‌ আপনার কোনো সমস্যা নাই। আপনার যদি কোন প্রবলেম থাকে, তাহলে ভালোভাবে রুকইয়াহ শুনলে অবশ্যই এর প্রভাব টের পাবেন।

2. আর সম্ভব হলে প্রতিদিন, নইলে একদিন পরপর রুকইয়ার গোসল করবেন। একদম সুস্থ হওয়া পর্যন্ত।
রুকইয়ার গোসলের পদ্ধতি হচ্ছে-

একটা বালতিতে পানি নিবেন, তারপর ওই পানিতে দুইহাত ডুবিয়ে নিচের জিনিশগুলো পড়বেন (যদি টয়লেট আর গোসলখানা একসাথে হয় তখন এসব অবশ্যই বাহিরে এনে পড়তে হবে) –

“কোন দরুদ শরিফ ৭বার, ফাতিহা ৭বার, আয়াতুল কুরসি ৭বার, তিনকুল (ইখলাস, ফালাক্ব, নাস) প্রত্যেকটা ৭বার, শেষে আবার দরুদ শরিফ ৭বার”

পড়ার পর হাত উঠাবেন, এবং পানি দিয়ে গোসল করবেন। (এগুলা পড়ে পানিতে ফু দিবেন না.. এমনিই গোসল করবেন)

প্রথমে এই পানি দিয়ে গোসল করলেন পরে অন্য পানি দিয়ে ভালোমতো করলেন, সমস্যা নাই। যার সমস্যা সে যদি পড়তে না পারে, তাহলে অন্যজন পানিতে হাত রেখে পড়ে দিবে, এরপর গোসল করবেন।

আবশ্যক নয়; তবে উত্তম হচ্ছে, প্রথমে রুকইয়াহ শুনে এরপর গোসল করতে যাবেন।

মোটকথা, প্রতিদিন রুকইয়া শুনবেন এবং উপরের নিয়ম অনুযায়ী রুকইয়ার গোসল করবেন। সমস্যা অনুযায়ী ৩-৭ থেকে দিন লাগতে পারে। সমস্যা বেশি মনে হলে ২১দিন করতে পারেন। সমস্যা ভালো হয়ে রুকইয়া শুনলে আর কিছুই ফিল করবেন না, তবে সমস্যা ভালো হওয়ার পরেও ২-৩দিন রুকইয়া করা উচিত।

[ঙ]

বদনজর থেকে বাঁচার জন্য কি করবো?

আগের পর্বে বিস্তারিত বলা হয়েছে। প্রয়োজনে দেখে নিন, সংক্ষেপে কিছু টিপস হচ্ছে-

১। সব কথার আল্লাহর মাঝে আল্লাহর জিকির করবে, উদাহরণ আগের পর্বে দেয়া হয়েছে।

২। হাদিসে বর্ণিত সকাল সন্ধ্যার দোয়াগুলো পড়বে, বিশেষতঃ “বিসমিল্লাহিল্লাযি….” এটা আর তিন ক্বুল তিনবার।

৩। মেয়ে হলে অবশ্যই পর্দার অভ্যাস করবে।

৪। আর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে উচিত হলো, মাঝেমধ্যেই সুরা ফালাক নাস পড়ে বাচ্চাদেরকে ফুঁ দিবেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটা করেছেন।

৫। এই দু’আ সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার পড়ে বাচ্চাদের ফুঁ দিয়ে দিবেন, নিজের জন্যও পড়বেন (পিকচার বানিয়ে কমেন্টে দিলাম) –

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

আল্লাহ আমাদেরকে সকলপ্রকার অনিষ্ঠ থেকে হিফাজত করুন। আমীন।

Leave a Reply

ে ি মতামত

  1. দ্বিতীয় পদ্ধতির দুয়া ২,৩ তো অন্যের জন্য করা হচ্ছে – ‘বিসমিল্লাহি আরকিক”। এখন কেউ নিজের জন্য পড়লে কি দুয়া পরিবর্তন করতে হবে? যেভাবে আউজু-উইজু-উইজুকুমা পরিবর্তন করা হয়, এখানে ব্যপারগুলো একটু ডিটেইলস বুঝাইলে ভালো হয়। নাকি নিজের জন্য পরলেও ‘বিসমিল্লাহি আরকিক’ [পড়বে?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

nineteen − sixteen =