তাবিজ জায়েজ হলেও কেন তাবিজ থেকে দূরে থাকবেন?

কোন ফতোয়া দেয়া বা কারও সমালোচনা করা এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়।

হানাফি ফিকহের ফতোয়া অনুযায়ী তাবিজ জায়েজ। তবে কিছু শর্ত আছে। কি শর্ত? ইসলামে কয়েক প্রকার তাবিজ জায়েজ নয়। যথা-

  1. কুরআন হাদীস দ্বারা ঝাড়ফুক দেয়া ছাড়া শুধু তামা, পিতল বা লোহা দ্বারা তাবিজ বানিয়ে লটকিয়ে রাখা। অর্থাৎ শুধু এগুলো লটকানো দ্বারাই রোগমুক্ত হওয়া যাবে বিশ্বাস করে তা লটকানো নাজায়িজ।
  2. এমন তাবিজ যাতে আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত, দুআয়ে মাসূরা ব্যতিত শিরকী কথা লিপিবদ্ধ থাকে।
  3. তাবীজকে মুয়াসসার বিজজাত তথা তাবীজ নিজেই আরোগ্য করার ক্ষমতার অধিকারী মনে করে তাবিজ লটকানো। এ বিশ্বাস জাহেলী যুগে ছিল, বর্তমানেও ইসলাম সম্পর্কে কিছু অজ্ঞ ব্যক্তিরা তা মনে করে থাকে।
  4. যে কালামের অর্থ জানা যায় না এমন শব্দ দ্বারা তাবিজ লেখা।
  5. আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় তাবিজ লেখা।

(সোর্সঃ আহলেহক মিডিয়ার ফতোয়া)

জায়েজ শুনেই আমরা লাফ দিয়ে উঠি। জায়েজ হলেই কি আমল করা শুরু করব? তালাকও তো জায়েজ। এখন কি গনহারে তালাক দেয়া শুরু করব?
কুরআন আল্লাহর বানী। এর তেলাওয়াত করা আল্লাহর সাথে কথোপথনেরই নামান্তর। অনেক উত্তম ইবাদত। কুরআন কি তাবিজ বানিয়ে ঝুলানোর জন্য নাযিল হয়েছে? এটা কি কুরআনুল কারীমের অবমাননা নয়? নিজের অবস্থান এক পাশে রেখে একটু চিন্তা করি ঠিকমত।

১। অনেক তাবিজ সরাসরি যাদু। এতে কুরআন হাদিসের কোন চিহ্নই নেই। যার কোন রোগ নেই সে যখন এই তাবিজ নিজের গায়ে লাগায় এর মানে হল সে নিজেকে যাদুগ্রস্থ করল। আর যদি রোগ থেকেও থাকে সে নতুন যাদুতে আক্রান্ত হল।
২। অনেক তাবিজ কুরআনের আয়াত আছে। কিন্তু আয়াতের আগে কোন সংখ্যা লেখা, কোন কোড লেখা। সেই কোডের অর্থ করলে হয়ত এমন দাঁড়াবে, “আমি নিচের কথাগুলো বিশ্বাস করি না।” মানে তাবিজ যদি আয়াতুল কুরসী লেখা থাকে তাহলে মানে দাঁড়ায় আমি আয়াতুল কুরসিতে বিশ্বাস করি না। (নাউযুবিল্লাহ) জেনে বুঝে যদি কেউ আয়াতুল কুরসী বিশ্বাস না করে তাহলে সে কি মুসলমান থাকবে? (বিজ্ঞ মুফতীর থেকে জেনে নিবেন)
৩। আরবী সংখ্যাগুলো চিনে নিবেন। অনেক তাবিজে দেখবেন শুধু সংখ্যা লেখা ঘর করে। পুরনো আমলের কুরআন শরীফের পিছনেও দেখবেন এমন সংখ্যা লিখে অমুক সুরার নকশা। এসব অর্থহীন সংখ্যা নিঃসন্দেহে জায়েজ নাই। বরং জ্যোতিশীরা এসব সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামায়। ইসলাম জ্যোতিশীদের সম্পর্কে কি বলে তা একটু খুজে দেখেন।
৪। মুখ দেখেই অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত বলে দিতে পারে আর পাথরের আংটি / তাবিজ বিক্রি করে। বসুন্ধরায় অফিস। সিনেমার স্টাররা তার বিজ্ঞাপনে অভিনয় করে। কোথায় আছে এইগুলো ইসলামে?
৫। এমন তাবিজ পাবেন যা লেখা হয়েছে মহিলাদের নাপাক রক্তে। শয়তানের নামে বলি দেয়া কোন প্রানীর রক্তে। এমন রক্তে কুরআনুল কারীমের আয়াত লেখা কত বড় কুফরি হতে পারে?
৬। তাবিজ পাবেন সবই ঠিক আছে। কুরআনের আয়াত লেখা হয়েছে, কালিও পবিত্র। নাকের কাছে ধরলে প্রস্রাবের গন্ধ। মানে কুরআনের আয়াত লিখে এরপর এর উপর কবিরাজ প্রস্রাব করেছে। (নাউজুবিল্লাহ)
৭। তাবিজে আয়াতুল কুরসী বা কোন কুরআনের আয়াত লেখা কিন্তু ফাকে ফাকে জিবরাইল, মিকাঈল বা কোন শয়তানের নাম লেখা। এটা কি আল্লাহর সাথে শিরক নয়?
৮। নামায, রোযা, কুরআন তেলাওয়াতের খবর নেই। তাবিজ ঝুলিয়ে দিলেন বাহুতে/গলায়/কোমরে দিলেন। কি ভাবছেন, হয়ে গেল? এতই সহজ?
৯। আপনার সামনেই তাবিজে কিছু পড়ে ফু দিয়েছে, সুতায় গিট দিয়েছে। কুরআনের আয়াত পড়েছে নাকি অন্য কিছু পড়েছে আপনি জানলেন কিভাবে? আপনি কিভাবে শিউর হলেন উনি কুরআনের আয়াত পড়েছেন?
১০। কি বলেন ভাই এত পরহেজগার লোক, ধোকা দিবে? না, পরহেজগার লোক হলে ধোকা দিবে না। কিন্তু পরহেজগার কিনা বুঝবেন কি করে? লম্বা দাড়ি, টুপি, লম্বা জুব্বা কি পরহেজগারীর মাপকাঠি? অনেক যাদুকর আছে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বেশ ধরে। নামায পড়ে কিন্তু অযু করে না। ইনসেস্টসহ হেন কোন কুকর্ম নেই যা করে না। যে যত বেশি কুকর্ম করতে পারবে সে যাদুর জগতে তত উপরে চলে যাবে। তার যাদু তত কার্যকর হবে। যে যাদু করে সে কি ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যায় নি?
১১। তাবিজ খুলতে নিষেধ করে, ভয় দেখায় তাবিজ খুললেই নাকি চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। আসলে যে জাড়িজুড়ি ফাস হয়ে যাবে এই কারনে খুলতে না করে।
১২। কিছুদিন ব্যবহারের পর তাবিজ হারিয়ে যায়। আবার নতুন তাবিজ নেয়া লাগে। ব্যবসা কিভাবে টিকবে না হারালে?
১৩। পূর্নিমার সময় যেতে হবে, অমাবস্যার সময় যেতে হবে, সন্ধ্যার পর যেয়ে তাবিজ আনতে হবে, অমুক দিন যেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ইসলামে এমন কিছু আছে? কোনোদিন নিজেকে প্রশ্ন করেছেন?
ফিতনার আশংকায় সহশিক্ষা পছন্দ করেন না। মানুষ শিরক করছে, কুফরীতে লিপ্ত হছে তবুও এমন তাবিজের বিরুদ্ধে, সকল তাবিজের বিরুদ্ধে কথা বলেন না। কিভাবে পারেন আপনারা? সহশিক্ষার ফিতনার চেয়ে তাবিজের ফিতনা ছোট হয়ে গেল?

✅ কি করবেন?
১। যে যতটুকু কুরআন পারেন, যতটুকু দুআ পারেন প্রতিদিন তেলাওয়াত করবেন সুস্থতার নিয়তে, আল্লাহ তায়ালা যেন শয়তান থেকে বাচিয়ে দেন এই নিয়তে। আর বেশি বেশি দুআ’ করবেন। আর নির্ধারিত দুআ’গুলো পারলেতো খুবই ভাল।
২। মা-বাবার গাফলতের কারনে সন্তান আক্রান্ত হয়। কাজেই নিজের সন্তানকে যদি সুরক্ষিত রাখতে চান তাহলে পরিবারে দ্বিনি পরিবেশ কায়েম করুন। নামায, পর্দা, হালাল রুজিতে মনোযোগি হোন। সন্তানকে নামায শিক্ষা দিন।
৩। ছোট থেকে বাচ্চাদের দুআ’-দরুদ মুখস্থ করাতে ট্রাই করুন। যতদিন মুখস্থ না করতে পারবে ততদিন দুআ’ পড়ে সকাল, সন্ধ্যা ও ঘুমের আগে সারা গায়ে ফু দিন। আল্লাহর কাছে দুআ’ করবেন। মনে রাখবেন, সন্তানের জন্য পিতার দুআ’ কবুল। আল্লাহই কি যথেষ্ঠ নন?
৪। নিজের পানি পড়া নিজেই তৈরি করুন। সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, চার কুল সহ অন্য যেসব সুরা পারেন সেগুলো পরে নিজেই পানিতে ফু দিয়ে নিজেই খান, নিজের বাচ্চাকে খাওয়ান। আর হুজুরের কাছে গেলে হুজুর কি পড়ে সেটা যেন আপনাকে শুনিয়ে পড়ে এই অনুরোধ করবেন। বা হুজুর থেকে জেনে নিবেন কি কি আয়াত পড়ে। সেগুলো পড়ে নিজেই পানি তৈরি করে ব্যবহার করতে পারেন।
মনে রাখবেন, ইসলামে সবকিছু স্বচ্ছ, পরিষ্কার। লুকোচুরি বা চুপিচুপি কিছু নেই। কেউ লুকোছাপা করতে চাইলে বুঝে নিবেন ঘাপলা আছে। দূর থাকবেন।
মোদ্দা কথা, তাবিজ জায়েজ হলেও তাবিজ ব্যবহার করব না। কুরআন, সুন্নাহ অনুযায়ি বিভিন্ন আমল করব, দুআ’ করব। জায়জের ফাঁদে পড়ে অজ্ঞতাবশত শিরক/কুফরিতে লিপ্ত হয়ে নিজের ঈমান-আমলকে হুমকির মুখে ফেলব না, এরচেয়ে সমস্যা নিয়ে মরে যাওয়া ভাল। আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাওয়া যাবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে আল্লাহ তায়ালা আমাকে প্রথমে আমল করার তৌফিক দিন। এরপর অন্যদের। আমীন।


আরও পড়ুন – জাদুর জিনিস বা তাবিজ নষ্ট করার নিয়ম

আরও পড়ুন – জাদু টোনা থেকে বাঁচতে করণীয়

Facebook Comments

Default Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

ষাট এক − = পঞ্চাশ পাঁচ