ওয়াসওয়াসা সমস্যার জন্য সংক্ষিপ্ত পরামর্শ

[প্রারম্ভিকা]
‘ওয়াসওয়াসা রোগ’ এবং ‘শুচিবাই বা ওসিডি’ – এসব সমস্যা প্রায় কাছাকাছি। বিস্তারিত আলোচনা অন্য কোনদিন ইনশাআল্লাহ। সংক্ষেপে বললে সমস্যাগুলোর ধরন এরকম-
১. অকারণে সর্বদা চিন্তিত থাকা। মাথায় বিক্ষিপ্ত চিন্তা ঘোরাঘুরি করার কারণে কোন কিছুতে মন দিতে না পারা।
২. ওযু-গোসল অথবা নামাজের বিশুদ্ধতা নিয়ে অতিরিক্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা।
৩. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা। টয়লেট বা গোসলখানায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা। এক অঙ্গ বারবার ধোয়া, এরপরেও তৃপ্ত হতে না পারা।
৪. বারবার মনে হওয়া ওযু ভেঙ্গে যাচ্ছে, অথবা প্রসাবের ফোঁটা পড়ছে, অথবা বায়ু বের হয়ে যাচ্ছে। বিশেষতঃ নামাজের সময় এমন হওয়া।
৫. অনিচ্ছাকৃতভাবে বারবার আল্লাহ তা’আলা, রাসুল ﷺ অথবা ইসলামের ব্যাপারে অবমাননাকর চিন্তা মাথায় আসা।
৬. বারবার নামাজের রাকাত ভুলে যাওয়া, কিরাত, রুকু-সাজদা ইত্যাদির ব্যাপারে সন্দেহে ভোগা।
সমস্যা বেশিদিন পুরনো হয়ে গেলে এসব থেকে আরও শারীরিক-মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। আর জাদু অথবা জিন সংক্রান্ত কোন সমস্যা (জিনের বদনজর বা জিনের আসর) থাকলেও ওয়াসওয়াসার সমস্যা প্রকট হতে পারে।
সমস্যার মাত্রা অনুযায়ী পরামর্শ তিনভাগে ভাগ করলাম, যেকোন ধরনের ওয়াসওয়াসা আক্রান্ত ব্যক্তি এটা শুরু থেকে ফলো করতে পারেন। আগে ১মটা এরপর দরকার হলে ২য়টা, এরপর ৩য়… এভাবে।
  • লক্ষণীয়, সবগুলোর সাথেই সকাল-সন্ধ্যা, ঘুমের পূর্বের এবং অন্যান্য সময়ের মাসনুন যিকর “মনোযোগ দিয়ে” করবেন। এটা যেহেতু সবারই করতে হয়, তাই বারবার উল্লেখ করলাম না
(বেসিক মাসনুন আমলঃ https://ruqyahbd.org/masnun | অথবা মাসনুন আমল অ্যাপঃ http://bitly.com/masnun-app )
.
[১ম পরামর্শ]
প্রাথমিক কাজ ৩টি, মেয়াদ ৩দিন-
১। সকাল-সন্ধ্যায় মাসনুন আমলের সাথে সূরা মূমিনুন ৯৭-৯৮ আয়াতের দোয়া ৩বার করে পড়বেন।
رَبِّ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِيْنِ – وَأَعُوْذُ بِكَ رَبِّ أَن يَّحْضُرُوْنِ
২। সকালে খালি পেটে এক গ্লাস পানি খাবেন। খাবার আগে, পানির মধ্যে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস- ৩বার করে পড়ে ফুঁ দিবেন। সম্ভব হলে এর সাথে আয়াতে শিফা ৬টি পড়ে নিবেন।
[আয়াতে শিফা: সুরা তাওবা ১৪, সুরা ইউনূস ৫৭, সূরা নাহল ৬৯, সুরা বানী ইসরাইল ৮২, শু’আরা ৮০ এবং সূরা হা-মীম সাজদা ৪৪ নং আয়াত। আয়াতগুলোর পিডিএফ পাওয়া যাবে এখানে- ruqyahbd.org/ayat ]
৩। প্রতিদিন সকাল-বিকাল বা সুবিধামত নির্দিষ্ট ২টা সময়ে রুকইয়াহ করবেন।
রুকইয়ার নিয়ম: আপনার সমস্যা মনে করে এটার জন্য রুকইয়াহ করার নিয়াতে মাথায় (একটা বা দুইটা) হাত রাখবেন, এরপর সম্পূর্ণ মনোযোগের সাথে আউযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবেন ৭বার। প্রতিবার পড়া সূরা ফাতিহা শেষ করে বুকে ফুঁ দিবেন, আর একদম শেষে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে পুরা শরীর মুছে নিবেন।
এভাবে কোন গ্যাপ না দিয়ে ৩দিন সকাল-বিকাল রুকইয়া করবেন।
.
[২য় পরামর্শ]
যাদের সমস্যা একটু বেশি, তারা ওপরের কাজগুলো করার পর ১দিন বিরতি দিবেন। এরপর নিচের কাজগুলো করবেন ৩ থেকে ৭দিন।
১। পূর্বে উল্লেখিত ‘সূরা মূমিনুন ৯৭-৯৮’ আয়াতের দোয়া দুটি ৩বার করে পড়বেন প্রতি সালাতের পরে।
২। সকালের খালি পেটে পানি খাবেন। পানিতে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস- ৩বার করে পড়বেন, সাথে ৬টি আয়াতে শিফা পড়বেন ৩বার করে। [আয়াতে শিফার লিস্ট পূর্বে বলা হয়েছে]
৩। প্রতিদিন দুইবার ওপরে বলা নিয়মে রুকইয়াহ করবেন- তবে রুকইয়ার মাঝে সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস ফালাক নাস- ৩বার করে এবং সূরা বাকারা ১-৫ আয়াত, আয়াতুল কুরসি এবং পরের দুই আয়াত, শেষ ৩ আয়াত- একবার করে পড়বেন।
৪। সম্ভব হলে এর সাথে রুকইয়ার গোসল করবেন। (আগের পয়েন্টে বলা আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করা…)
মোটামুটি ভাল মাত্রার সমস্যাও আল্লাহ চায়তো এই রুকইয়াতে ভাল হয়ে যাবে। উপকারিতা বুঝতে পারলে এই পরামর্শগুলো আপনি ৩দিনের যায়গায় লাগাতার ৭দিন অনুসরণ করতে পারেন।
(এসব নিয়ম অনুসরণ করা শেষে পরবর্তী পরামর্শের জন্য ‘আমাকে মেসেজ না দিয়ে’ অনুগ্রহ করে রুকইয়াহ গ্রুপে আপডেট জানান)
.
[তৃতীয়ত]
যাদের সমস্যা অনেক বেশি অথবা অনেক পুরনো, তাদের জন্য আরেকটু বেশি রুকইয়াহ করা লাগতে পারে।
যেমন- প্রতিদিন দুইবেলা রুকইয়ার পানি খাওয়া, গোসল করা, সূরা বাকারা থেকে তিলাওয়াত করা, রুকইয়াহ শোনা অথবা রুকইয়ার আয়াতগুলো মনোযোগের সাথে তিলাওয়াতের মাধ্যমে রুকইয়া করা ইত্যাদি।
যেহেতু জ্বিন – যাদুর সমস্যার জন্যও ওয়াসওয়াসা হয়ে থাকে, তাই কারও কারও ক্ষেত্রে অন্য কাউকে দিয়ে সরাসরি রুকইয়াহ করানোর প্রয়োজন হতে পারে। কমসে কম এজন্য অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিয়ে আপনার অবস্থা অনুপাতে নিয়ম মাফিক রুকইয়াহ করলেই সবচে ভাল হবে মনে করি।
শুধু ওয়াসওয়াসা রোগ বা ওসিডির সমস্যা হলে আল্লাহ চায়তো কিছুদিন গুরুত্বের সাথে রুকইয়াহ করলেই এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। এজন্য অতিরিক্ত মেডিসিন বা থেরাপির প্রয়োজন হবে না।
.
[শেষ কথা]
নির্ধারিত এসব পরামর্শের বাহিরে প্রতিদিন এই দোয়াগুলো এবং ইস্তিগফার বেশি বেশি পড়া সবার জন্যই উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ।
এক.
أَعُوذُ بِاللّهِ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ مِنْ هَمْزِه وَنَفْخِه وَنَفْثِه
দুই.
أُعِيْذُكُمْ بِكَلِمَاتِ اللّهِ التَّامَّةِ، مِنْ غَضَبِه وَعِقَابِه وَشَرِّ عِبَادِه وَمِنْ همَزَاتِ الشَّيَاطِيْنِ وَأَنْ يَّحْضُرُوْنِ
তিন.
اَلْلّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ، وَقَهْرِ الرِّجَالِ
আল্লাহ আমাদেরকে মানুষ এবং জ্বিন শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হিফাজতে রাখুক। সব ধরনের শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক রোগ-ব্যাধি থেকে আরোগ্য দান করুক। আমিন।

Facebook Comments

Default Comments (4)

4 responses to “ওয়াসওয়াসা সমস্যার জন্য সংক্ষিপ্ত পরামর্শ”

  1. আসসালামু আলাইকুম ।
    ৬ নম্বরে , রুকইয়াহর মাঝে যেগুলো পড়তে বলা হলো , সেগুলো কি সুরা ফাতিহা পড়ে ফু দিয়ে তারপর পড়বো দিয়ে আবার সুরা ফাতিহা পড়ে ফু দিবো দিয়ে আবার পড়বো – এভাবে পড়বো ? এরকম হলে , ফাতিহা পড়ে ফু দেওয়ার পর যখন এগুলো পড়োবো , তখন কি মাথা থেকে হাত নামিয়ে রাখা যাবে ? শেষবার সুরা ফাতিহা পড়ে পুরো শরীরে হাত মুছার পরে কি এগুলো পড়বো , নাকি শুধু মাঝখানগুলোতে ?
    শেষবার সুরা ফাতিহা পড়ার পর দুই হাতে ফু দিয়ে পুরো শরীর মুছার সময় কি লজ্জাস্থানগুলোও মুছবো ?
    ৭ নম্বরে ওপরের আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফু দিয়ে গোসল করতে বলা হয়েছে । কোন আয়াতগুলো পড়ে ফু দিবো ? আয়াতে শিফাগুলো ?

  2. ওয়াসওয়াসা প্রতিকারে
    রমযান মাসে খালি পেটে পানি খাওয়ার আমল কিভাবে করা যেতে পারে জানালে বিশেষভাবে উপকৃত হবো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + eight =