Ruqyah Support BD

সুলাইমান আ. এর নামে কবিরাজদের দেয়া অপবাদের খণ্ডন

জিনের সাহায্য নেয়ার পক্ষে দলিল হিসেবে সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর ঘটনা উল্লেখ করতে দেয়া যায় অনেককে। এটা ভুল দলিল।

সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর এসব ঘটনা আমাদের জন্য দলিল না। এটা উনার জন্য ইউনিক। আমাদের রাসূল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের আমল কি ছিল সেটা দেখা জরুরি। উনারা তদবিরের জন্য জিনের সাহায্য চাইতেন কি না।

রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিন আক্রমণ করতে আসলে উনি ধরার পরেও ছেড়ে দিয়েছেন সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর কথা মনে করেই। সুলাইমান আলাইহিস সালামকে আল্লাহ যে ফ্যাসিলিটি দিয়েছে, সেটা অন্য কারও জন্য না। উনি দোয়া করেছিলেন –

قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ [٣٨:٣٥]

সোলায়মান বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কেউ পেতে পারবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।

..

عن أبي هريرة:] إنَّ عِفْرِيتًا مِنَ الجِنِّ تَفَلَّتَ البارِحَةَ لِيَقْطَعَ عَلَيَّ صَلاتِي، فأمْكَنَنِي اللَّهُ منه فأخَذْتُهُ، فأرَدْتُ أَنْ أَرْبُطَهُ على سارِيَةٍ مِن سَوارِي المَسْجِدِ حتّى تَنْظُرُوا إِلَيْهِ كُلُّكُمْ، فَذَكَرْتُ دَعْوَةَ أَخِي سُلَيْمانَ: رَبِّ هَبْ لي مُلْكًا لا يَنْبَغِي لأحَدٍ مِن بَعْدِي، فَرَدَدْتُهُ خاسِئًا.

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবীজি‎ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, একটি অবাধ্য ইফরিত জ্বিন গত রাতে আমার সালাতে বাধা দিতে এসেছিল। আল্লাহ্‌ আমাকে তার উপর ক্ষমতা প্রদান করলেন। আমি তাকে ধরলাম এবং মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার ইচ্ছে করলাম, যাতে তোমরা সবাই স্বচক্ষে তাকে দেখতে পাও। তখনই আমার ভাই সুলাইমান (‘আঃ)-এর এ দু’আটি আমার মনে পড়লো। হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন রাজ্য দান করুন, যা আমি ছাড়া আর কারও ভাগ্যে না জোটে- (সোয়াদ ৩৫)। অতঃপর আমি জ্বিনটিকে ব্যর্থ এবং লাঞ্ছিত করে ছেড়ে দিলাম।

– বুখারি ৩৪২৩

.

আমরা অন্য হাদিসে দেখেছি জ্বিনদের ক্ষতি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দোয়া শিখিয়ে দিচ্ছে জিবরীল আলাইহিস সালাম। (أعوذُ بوَجهِ اللهِ الكريمِ، وبكَلِماتِ اللهِ التّامّاتِ التي لا يجاوِزُهنَّ بَرٌّ ولا فاجِرٌ)  আমরা সেই দোয়াটা প্রতিদিন পাঠ করি।

সুতরাং আমরা এদের থেকে দূরে থাকবো, এদের ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইবো, বেশি ঝামেলা করতে আসলে মাইর লাগাবো। সাহায্য চাওয়ার প্রশ্নই আসে না।

….

আর মূলতঃ সুলাইমান আলাইহিস সালামও জিনদের সাহায্য নেননি, বরং জিনরা উনার কাজ করতে বাধ্য ছিল। এজন্য সুলাইমান আলাইহিস সালামের ইন্তিকালের পরে তারা অন্য নবী কিংবা বাদশাহদের আনুগত্য করেনি। কোরআনে আছে – পানির শয়তানরাও উনার অনুগত ছিল। এখন এতে পানিতে থাকা শয়তানদের কাছে সাহায্য চাওয়া বৈধ হয়ে যায় না।

আরেকটা বিষয় হলো, সুলাইমান আলাইহিস সালামের ওপর জাদুচর্চা-জিনসাধনার অপবাদ আজকে নতুন না। পূর্বের কিতাবি কাফেররাও এরকম অপবাদ দিত। এজন্য আল্লাহ কোরআনে আয়াত নাযিল করেছিলেন –

وَ اتَّبَعُوۡا مَا تَتۡلُوا الشَّیٰطِیۡنُ عَلٰی مُلۡكِ سُلَیۡمٰنَ ۚ وَ مَا كَفَرَ سُلَیۡمٰنُ وَ لٰكِنَّ الشَّیٰطِیۡنَ كَفَرُوۡا یُعَلِّمُوۡنَ النَّاسَ السِّحۡرَ ٭ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ عَلَی الۡمَلَكَیۡنِ بِبَابِلَ هَارُوۡتَ وَ مَارُوۡتَ ؕ

“আর সুলাইমানের রাজত্বে শয়তানরা যা আবৃত্তি করত তারা তা অনুসরণ করেছে। আর সুলাইমান কুফরী করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে শিক্ষা দিত জাদু এবং যা বাবিল শহরে হারূত-মারূত ফিরিশতাদ্বয়ের উপর নাযিল হয়েছিল……।” (বাকারা ১০২)

(এই আলোচনা আরও লম্বা করা যেত, কিন্তু আমজনতার বুঝার সহজার্থে সংক্ষেপ করা হল।)

…..

বাস্তব কথা হল  –

১. আমভাবে বিশেষ স্বার্থ বা শয়তানি পরিকল্পনা ব্যতীত জিন কাউকে সাহায্য করে না। যদি এক-দুইটা এক্সেপশন থাকে, সেটার হিসেব ভিন্ন। এজন্য আমভাবে সবাইকে অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই, এই বিষয়ে দুর্বলতা দেখানো মোটেই উচিত না। (এখানে ‘দ্বরর’ এতই বেশি যে, সামান্য নফা’র সুযোগ নিতে গিয়ে ঈমান ঝুঁকিতে ফেলতে পরামর্শ দেয়া কোনো বুদ্ধিমান ফকিহের কাজ হতে পারে না।)

২. যদিও স্বেচ্ছায় কোনো জ্বিন আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য অফার করে, তবুও এথেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত। বলা উচিত ‘তোমরা যা খুশি করো গিয়ে, আমার সাথে তোমাদের সম্পর্ক নেই, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট’। কারণ শয়তানরা এভাবে অনেক মানুষকে শুরুতে “ফ্রি চা” খাইয়ে তাদের ওপর নির্ভরশীল বানিয়ে নিয়েছে,  এখন তারা জিনের সাহায্য নেয়ার জন্য সেই কাজগুলোই করে, যা গতানুগতিক তান্ত্রিকরা করে থাকে। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন।

৩. অনেকে নাকি জিনের সাহায্য নেয় না, ফেরেশতার সাহায্য নেয়! এটা মিথ্যা কথা। ফেরেশতারা নিজ ইচ্ছায় কিছু করে না। যতক্ষণ না আল্লাহর হুকুম হয়। কিয়ামতের দ্বীন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন “এরা কি তোমাদের উপাসনা করতো?” ফেরেশতারা বলবে “না ইয়া রব! এরা জীনদের পূজা করতো, জিনদের কথাই বিশ্বাস করতো” (সুরা সাবা; ৪১)

قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِم ۖ بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ ۖ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ

৪. কবিরাজরা ভাবে তারা জিন-শয়তানকে অনুগত বানিয়ে কাজ করাচ্ছে, আসলে কখন সে নিজেই যে শয়তানের অনুগত হয়ে গেছে। অনেকে টেরও পায় না।

৫. আমাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হল, নবীজি সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম এবং পুর্বসুরি ইমামদের পদ্ধতি। তারা ঝাড়ফুঁকের জন্য জ্বিনের সাহায্য চাইতেন নাকি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন?

তারা যে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন, আমরাও তার কাছেই সাহায্য চাইবো।

মন্তব্য করুন