জ্বিন আসরের প্রকারভেদ কি কি ও মানুষ কখন আক্রান্ত হয়?

জ্বিন আসর করার প্রকারভেদ আলোচনা করে আজকের পর্ব শুরু করা যাক। আচ্ছা তার আগে জেনে নেয়া উচিত জ্বিনের আসর ব্যাপারটা বুঝাতে কি কি শব্দ ব্যবহার হয়।

বাংলায় যেমন জ্বিনে ধরা, আসর করা, ভর করা, বাতাস লাগা ইত্যাদি ব্যবহার হয়, আরবীতে তেমন আল-মাসসু / মাসসে শাইতান – শয়তানের স্পর্শ (المس) আস-সর’উ / সর’উল জ্বিন – জ্বিন ধরা possession of jinn (الصرع) [মৃগীরোগ (Epilepsy) বুঝাতেও আস-সর’উ ব্যবহার হয়] আস-বুল বালা – বিপদে ধরা (اصاب البلاء) এরকম বিভিন্ন শব্দ দিয়ে এটা বুঝায়।

তো জ্বিন কয়েকভাবে আসর করতে পারে, অথবা আরেকটু শুদ্ধভাবে বললে.. জ্বিন দ্বারা মানুষ কয়েকভাবে আক্রান্ত হয়:

১। পুরো শরীর আক্রান্ত হওয়া। যাকে স্বাভাবিকভাবে আমরা “অমুককে জিনে ধরেছে” বলি। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের শরীরের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারায়, জ্বিন তার মুখ দিয়ে কথা বলে, সব অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। তাকে আঘাত করলে জ্বিন ব্যাথা পায়।

২। শরীরের কোনো অঙ্গ যেমন হাত, পা অথবা মাথা আক্রান্ত হওয়া। এটা কয়েকভাবে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বিন হাতে বা পায়ে ঢুকে থাকে যেখানে সবসময় ব্যাথা করে, অথবা একদম অচল হয়ে যায়। কিংবা ব্রেইনে ঢুকে থাকে, যার ফলে মাঝেমধ্যে উল্টাপাল্টা আচরণ করে, কেউ এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ পাগল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে যেমন এক অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে, তেমন একাধিক অঙ্গও হতে পারে। একটা জ্বিন যেমন শরীরে ঢুকে থাকতে পারে, একটা মানুষের শরীরে একাধিক জ্বিনও থাকতে পারে।

বাস্তবতা বুঝতে সহজভাবে ভাবুন, “শয়তান মানুষের রগের ভেতর দিয়ে চলাচল করে” (তারাও জিন) এটাতো সাফ হাদিস তাইনা? আচ্ছা! এখন আপনার পায়ে কতগুলা রগ আছে আপনি চিন্তা করেন দেখেন তো!

একজন মিসরীয় শায়খের ঘটনা, উনার কাছে একজন রুগী আসলো, যার এক পা একদম অচল হয়েছিলো “ডাক্তাররা কোনো সমস্যা খুজে পাচ্ছিলো না” (point to be noted) তো শায়খ যখন উনার মাথায় হাত রেখে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়লেন, তখন রুগীর মুখ দিয়ে জ্বিন কথা বলে উঠলো, সে মুসলমান ছিলো.. তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে চলে যেতে রাজি করানোর সময় জানা গেলো, এই শরীরে আরো দুইটা জ্বিন আছে যারা খ্রিষ্টান! তো এরকমও ঘটতে পারে। (আল্লাহ হিফাজত করুক)

৩। স্বল্প সময়ের জন্য আক্রমণ করা।

জ্বিন যেমন শরীরের মাঝে ঢুকে দীর্ঘসময় থাকতে পারে, তেমনি কোনো ক্ষতি করে তখনি বের হয়ে যেতে পারে। তবে মাঝেমাঝে ঢুকে আবার চলে যায়, আবার ঢুকে আবার যায়.. এমন ঘটনা খুব কম। কারণ ‘কোনো মানুষের শরীরে ঢোকা’ কাজটা জ্বিনের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য একটা বিষয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়তো কোনো একটা ক্ষতি করে (যেমন জ্বর বানিয়ে দিয়ে) তখনই চলে যায়, যেটাকে জিনের বাতাস লাগছে বলে। অথবা একবার শরীরে ঢুকে, চিকিৎসা করানোর আগে যেতে চায়না.. (এটাকে জিনে ধরছে বলে)

এখানে বলে রাখা ভালো যে, ‘তৃতীয়প্রকার’ তথা স্বল্প সময়ের জন্য জিন আক্রমণ করার মাঝে “বোবা ধরা”কেও গণ্য করেছেন অনেক অভিজ্ঞ আলেম।

আর হ্যা! উপরে যে পয়েন্টগুলো গেল সেগুলো তথা অতিপ্রাকৃতিক সমস্যাগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন হয়.. “কোনো ব্যথা বা রোগ আছে; অথচ মেডিকেল টেস্টে কিছু ধরা পড়ছে না!” এটা অহরহ দেখা যাচ্ছে.. বাস্তবে এটা জিন এবং বদনজর; উভয় ক্ষেত্রেই একটা মেজর সাইন! (বড় আলামত)

জ্বিন আক্রান্তের সবগুলো লক্ষণ আগামী পর্বে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

কোন কোন অবস্থায় জ্বিন মানুষের শরীরে ঢুকতে পারে! এটা এর আগে একদিন আলোচনা করা হয়েছে। সিরিজের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে আরেকবার উল্লেখ করা জরুরী ভাবছি..

খারাপ জ্বিন সর্বাবস্থায় আপনার ওপর আক্রমণ করতে পারে না। শয়তানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। সবসময় আপনাকে বশ করতে পারেনা। তবে আক্রান্ত হয়ে গেলেই সমস্যা।

খবিস জ্বিন ৪ অবস্থায় মানুষের ভেতর ঢুকতে পারে।

১. খুব ভীত অবস্থায় থাকলে
২. খুব রাগান্বিত অবস্থায় থাকলে
৩. খুব উদাসীন অবস্থায় থাকলে
৪. কুপ্রবৃত্তির গোলামী করা অবস্থায় (মানে যখন কোনো খারাপ কাজ করছে এই অবস্থায়)

তো এসব হচ্ছে খারাপ জ্বিন মানুষের ওপর আসর করার সময়। এ অবস্থায় নাকি জ্বিনের অনেক কষ্ট হয়, বিশেষত কেউ যদি দু’আ কালাম পড়ে, আর অপরদিকে জ্বিনকে যদি কোনো যাদুকর জোর করে পাঠায় তাহলে তো বেচারা জ্বিনের জান খারাপ। এদিকেও বিপদ, ওদিকেও বিপদ।

তো, ওসব ক্ষতি থেকে বাচতে আমাদেরকে হাদিসে বর্ণিত সকালসন্ধ্যার আমলগুলোর অভ্যাস করা উচিৎ আর সর্বোপরি গাফেল না হওয়া উচিৎ… তাহলে আল্লাহ চায়তো সহজেই আমরা খারাপ জ্বিনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারবো।

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।