জ্বিন বিষয়ক কিছু ঘটনা

প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্বে জ্বিন আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা প্রসঙ্গে অনেকগুলো ঘটনা বলা হয়েছে। তার মাঝে ছিলো রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘটনা, সাহাবা এবং অন্যান্য সালাফের ঘটনা।

আগেও বলেছি জ্বিন সিরিজ পুরোটাই পুস্তকি জ্ঞান আর গবেষণা(!) দিয়ে লেখা, এব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই। তো এক্ষেত্রে যে বইয়ের সর্বাধিক সহায়তা নিয়েছি, তা হচ্ছে ‘ওয়াক্বায়াতুল ইনসান, মিনাল জ্বিন্নি ওয়াশ শাইত্বন’ মিসরের শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালামের লেখা।

তো, এই বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে শায়খ নিজের কিছু অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন, আপনাদের জন্য সেগুলোর ভাবার্থ অনুবাদ করা হলো।

(লক্ষণীয়, ঘটনাগুলোতে ‘আমি’ বলতে শায়খ ওয়াহিদ উদ্দেশ্য, অনুবাদক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ নয়)

ঘটনা-১: এক মহিলাকে জ্বিন ধরেছিলো, আমি তার ওপর কিছু আয়াতে রুকইয়া তিলাওয়া করলাম। তখন জ্বিন কথা বলে উঠলো। নাম জিজ্ঞেস করার পর বললাম..
– এই মহিলাকে কেন ধরেছ?
— সে বাথরুমে আমার ওপর পড়েছিলো!
– আল্লাহর জন্য একে ছেড়ে দাও..
— না যাবো না
– তাহলে কোরআন শোনো। তখন আমি সুরা সাফফাতের প্রথম থেকে পড়লাম, সে কষ্ট পেয়ে কাঁদতে লাগলো। এবং বললো আমি চলে যাবো… আমি বললাম
– তাহলে এখনি চলে যাও..
— নাহ! যাবোনা!
এবার আমি সুরা জ্বিন শুরু থেকে পড়তে লাগলাম, সে বললো
– থামুন থামুন! আমি চলে যাচ্ছি। এরপর সে আসসালামু আলাইকুম বলে চলে গেলো।
.
ঘটনা-২: একজন মহিলা অসুস্থ ছিলো, তাকে আমার কাছে আনলে তার ওপর রুকইয়া করি, সুরা ফাতিহা শেষ হতেই জ্বিন কথা বলে ওঠে।
– তোমার নাম কি?
— মুহাম্মদ
– তার মানে তুমি মুসলমান?
— হ্যা
– তোমার সাথে আর কেউ আছে?
— হ্যা, আরেক আছে..
– তাকে আসতে বলো। এরপর মহিলার মুখ দিয়ে অন্য জ্বিন কথা বলে উঠলো..
– তোমার নাম কি?
— সুবহি
– মুসলমান?
— না, আমি খৃষ্টান!
– বয়স কত তোমার?
— ১৮
– কোনো যাদুকর এর কাজ করো?
— হ্যা! দাসুক এলাকার একজনের কাজ করি
এরপর আমি তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে অনুরোধ করলাম, সে কবুল করলো..
– এটা (কালিমা) কি তুমি শুধু মুখ দিয়ে বললা? নাকি অন্তর থেকেও?
— অন্তর থেকে বলেছি। সে কাঁদতে লাগলো আর বললো, আমিতো অনেক জনকে কষ্ট দিয়েছি, এরপরেও কি আল্লাহ আমাকে মাফ করবে?
– হ্যা! তুমি বিশুদ্ধভাবে তাওবা করো, আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দিবে…
— কিন্তু আমিতো অযু করতে জানিনা, নামায পড়তে পারিনা..
– কোনো মুসলিম জ্বিনের সাথে পরিচয় নেই তোমার?
— না, আমি তো আগে চার্চে যাতায়াত করতাম। কোনো মুসলিমকে চিনিনা।
– তুমি আমাদের মসজিদে নামাজের সময় আসবে, তাহলে মুসলিম জ্বিনদের পাবে, তাদের কাছে তুমি ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারবে। সে আমার মমতামত গ্রহণ করলো… এরপর বললাম
– এখান থেকে গিয়ে কি আবার যাদুকরের কাজ করবে?
— না, যাদু তো ইসলামে হারাম। আমি আর ওসব করবো না।
এরপর তার কাছে ওয়াদা নিলাম, এবং দুজনে আল্লাহর কাছে দুয়া করলাম যেন ইসলামের ওপর অটল থাকতে পারে। তারপর সে চলে গেলো। এবং প্রথম জ্বিন আসলো আবার… জিজ্ঞেস করলাম
– যা হলো এখানে, দেখেছো?
— হ্যা! দেখেছি, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে দেখে ভালো লাগলো।
এরপর আমি তাকে চলে যেতে বললাম, এবং ওয়াদা নিলাম। এরপর সে চলে।গেলো।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য

তৃতীয় ঘটনা: এক মহিলার হাতে প্রচণ্ড ব্যাথা ছিলো, ডাক্তার কোনো সমস্যা খুঁজে পায়নি। আমার কাছে আসলে আমি রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়লাম, সে তখন হাতে অবশ ফিল করতে লাগলো। আমি তাকে কিছু সাজেশন দিলাম (গত পর্বের শুরুতে বলা হয়েছে) এবং দুই সপ্তাহ পর আবার দেখা করতে বললাম। ওই মহিলা দুই সপ্তাহ পর এলে আমি আবার রুকইয়াহ করলাম। এবার একটা পরী কথা বলে উঠলো! নাম যাইনাব বিন আব্দুল উজুদ। জিজ্ঞেস করলাম
– তুমি মুসলমান?
— হ্যা..
– রুকইয়াহ করলে মুসলাম জ্বিনের ওপরেও প্রভাব হয়?
— হ্যা!
– কোন কোন সুরা পড়লে জ্বিনের কষ্ট পায়?
— সুরা ইয়াসিন, সফফাত, দুখান, সুরা জ্বিন
– আর সুরা বাকারা?
— হ্যা, সুরা বাকার পড়লেও কষ্ট হয়, এটা জ্বালিয়ে দেয়!
– প্রথমবার এই মহিলা আমার কাছ থেকে যাওয়ার পর কি হয়েছিল?
— আপনার পরামর্শ গুলো যখন মেনে চলছিল আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। বিশেষত, সে কোরআন পড়লে আমার খুব কষ্ট হতো। আর বিসমিল্লাহ বলে খানা শুরু করার কারনে আমি তার সাথে খেতেও পারছিলাম না। খানার মাঝে বিসমিল্লাহ বললেও যা খেয়েছি সব বমি হয়ে যেত!
– আচ্ছা! শয়তান আর জ্বিনের মাঝে পার্থক্য কি?
— শয়তানরাও জ্বিন, তবে ওরা কাফের এবং খুব অবাধ্য….
– এখন একে এছেড়ে চলে যাও.. কোন দিক দিয়ে বের হবে?
— মুখ দিয়ে। এরপর সে আসসালামু আলাইকুম! বলে চলে যায়…

ঘটনা ৪: একজন অল্প বয়সি মেয়েকে জ্বিন ধরেছিলো, জ্বিন মাঝেমাঝে ওর মুখ দিয়ে কথা বলছিলো। আমি ওর বাসায় আসলাম এবং ছবি ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে বললাম, এবং মেয়েকে হিজাব পরাতে বললা। এরপর রুকইয়া পড়তে যাব, তার আগেই মহিলা জ্বিন (পরী) কথা বলে উঠলো। তখন আমি সুরা দুখানের কিছুটা পড়লাম। এরপর পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞেস করলাম নাম কি? ধর্ম কি সাথে কেউ আছে?
— নাম নাজওয়া, আমি মুসলমান, সাথে আমার আম্মু আছে, উনার নাম ফাতিমা!
– উনাকে আসতে বলো।
এরপর ওই পরীর মা কথা বললো, তার বয়স ছিল ৪০বছর.. আমি তাকে আল্লাহর আযাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে চলে যেতে বললাম। এবং জিজ্ঞেস করলাম এর আগে কারো ওপর আসর করেছেন?
— হ্যা! আরো ৪জনের ওপর!
আমি উনাকে বুঝালাম, কেন মানুষকে কষ্ট দেয়া পাপ। এরপর তাওবাহ করে নফল নামাজ পড়ার নিয়ম শিখিয়ে দিলাম। এরপর সে ওয়াদা করে চলে গেলো। এরপর ‘নাজওয়া’ কথা বলে উঠলো.. জিজ্ঞেস করলাম
– তোমার বয়স কত?
— ২০ বছর
– বিয়ে করেছো?
— না, আমি নিয়াত করছি বিয়ে করবো না। ইবাদত – বন্দেগী করে জীবন পার করে দিব!
– ইসলাম এটা সমর্থন করেনা, তুমি একে ছেড়ে চলে যাও এবং পরহেজগার এজন জ্বিন খুজে বিয়ে করে নিও।
সে আমার পরামর্শ মেনে নিলো, এবং ওয়াদা করে চলে গেলো।

এরপর কয়েকটা ঘটনা সংক্ষেপে বলি-

১. একজন লোকের সাথে একটা মেয়ে জিন ঝামেলা করতো, তার ছেলে গিয়ে শাইখকে এটা জানায়। শাইখ বাসায় এসে লোকটির সাথে কথা বলেন, এবং উযু করে আসতে বলেন। এরপর তাকে রুকইয়া করলে মেয়ে জ্বিন কথা বলে ওঠে। উদ্ভট এক নাম বলে “স্টেথিরিয়স” বা এরকম কিছু.. ধর্মের কথা বললে চুপ থাকে, পরে বলে- ‘আমি আসলে ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছু জানিনা। আমরা জ্বিনের বিশেষ এক জাতি, যারা পানিতে থাকে। আমি লোহিত সাগরে থাকতাম..’ কেন আসর করেছে জিজ্ঞেস করলে এরকম বলে-
“লোকটা বয়স যখন ২০বছর ছিলো তখন অন্য একজনকে ধরেছিলাম, এই লোক তখন না জেনে অহেতুক মুর্খের মত আমাকে পিটিয়েছে! এজন্য তখনই আমি তার ওপর আসর করি, তবে পরে তাকে আমার পছন্দ হইছে!” আমি রাতে তার সাথে থাকি…. ব্লা ব্লা ব্লা………! (১৮+ ওয়ার্নিং!)
পরে ওকে ইসলাম গ্রহণ করে বললে ইসলাম গ্রহণ করে, এবং অনেক কাহিনীর পর বিদায় হয়।

২. এই ঘটনা শায়খের পরিচিত এক হাইস্কুল টিচার বর্ণনা করেছেন, শায়খ উনার ভাষায় নিজ বইয়ে এনেছেন। ১ মে ১৯৮৬ তে শায়খের একটা প্রোগ্রাম ছিলো, সেখানে উনি রুকইয়াহ বিষয়ে কিছু লেকচার দেন।
প্রোগ্রাম শেষে রাত্রে বেলা ৭-৮জন একসাথে বাড়ি ফিরছিলাম। যাওয়ার পথে একটা ছেলেকে বাসার বেলকনীতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। ওকে আমাদের দেখে ছেলেটা কেমন যেন ভয়ে চমকে ওঠে। বেলকনি থেকে লাফ অন্যদিকে লাফ দিতে চায়.. কিন্তু সাথের একভাই গিয়ে ধরে ফেলে। পরে দেখে তাকে জিন ধরেছে।
(এরপর অনেক লম্বা কাহিনী করে ওই ৭-৮জন মিলে জ্বিন ছাড়াইছে, ওদের কথার মধ্যেমধ্যে কিছু অংশ…)
– তুমি শাইখ ওয়াহিদকে ঘৃণা করো কেন?
— আব্বু বলেছে উনি কোরআন দিয়ে জিনে চিকিৎসা করে, মানুষকেও শিখায়… এজন্য…!
.
– আজকে রুকইয়া নিয়ে লেকচারের সময় সেখানে কোনো জ্বিন উপস্থিত ছিল?
— হ্যা! ১৫ জন ছিলো!!!
.
– তুমি তাহলে ইসলাম গ্রহণ করো…
— আচ্ছা! আমাকে কালিমা পড়িয়ে দিন..
– অমুক অমুক দিন নিয়মিত আমাদের মসজিদে বিভিন্ন আলেমরা বয়ান করেন.. ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তুমিও আসতে পারো…
— আচ্ছা আসবো!!
আমি জানতে চাই..

৩। এক মহিলা খুব অসুস্থ ছিলো, তার স্বামী অনেক ক্লিনিকে দৌড়াদৌড়ি করেও কোনো সুরাহা খুজে পায়নি। পরে আমার (শায়খ ওয়াহিদ আব্দুস সালাম এর) কাছে নিয়ে আসে, আমি রুকইয়াহ করি। এরপর বেশ ভারি এক কন্ঠ কথা বলে ওঠে।
– নাম কি তোমার?
— ইয়ুহান্না!
– তুমি কি খ্রিষ্টান?
— হ্যা!
– এই মুসলিম মহিলাকে কেন ধরেছ?
— এই মহিলার জন্য আমার ছেলে মুসলমান হয়েছে, তাই প্রতিশোধ নিতে এসেছি!
– মুসলমান হয়েছে তো প্রতিশোধ নেয়ার কি আছে এখানে?
— কারণ আমি খ্রিষ্টান জ্বিনদের চার্চের প্রিস্ট (পাদ্রী) আমার ছেলে ইসলামে কনভার্ট হয়েছে এটা আমার জন্য সহ্য করা কষ্টকর…
এরপর শায়খ উনাকে ইসলাম সম্পর্কে বুঝায়, জ্বিনটা কোরআন শুনতে চায়। শায়খ সুরা মায়েদা ৮২-৮৫ আয়াত পড়ে শোনান, আয়াতগুলো আসলেই খৃষ্টানদের কনভিন্স করার মত…. কমপক্ষে দুটি আয়াতের অর্থ এখানে না বললে ঘটনার স্বাদ অপূর্ণই থেকে যাব..

(৮২) আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরেকদেরকে পাবেন এবং আপনি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রীষ্টান বলে। এর কারণ এই যে, খ্রীষ্টানদের মধ্যে আলেম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহঙ্কার করে না। (৮৩) আর তারা রসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শুনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রু সজল দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরকেও মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।

শায়খের তিলাওয়াত শুনে জ্বিনটা কাঁদতে লাগে, এবং বলে কোরআন সত্য! আপনি সত্য বলছেন।

অনেক লম্বাচওড়া ঘটনা। শেষে ওই পাদ্রি জ্বিনটা নিজেও মুসলমান হয়ে যায়। আলহামদুলিল্লাহ্‌! এরপর ছেলেকে কাছে ডেকে নিয়ে চলে যায়।

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = three