আসক্ত/অনুগত/বশ করার যাদুর জন্য রুকইয়াহ

একধরণের যাদুর প্রচলন আছে বেশ, তা হলো ‘আসক্ত করার যাদু’। অর্থাৎ যাদু করে কাউকে নিজের প্রতি আসক্ত – অনুরক্ত বানিয়ে নেয়া। এটা সাধারণত পরিচিতজনদের মাঝেই কেউ করে থাকে। কখনো সন্দেহপ্রবণ স্ত্রী করে, কখনো সম্পদের লোভে পুত্র বা রক্ত সম্পর্কের কেউ করে। এই যাদুর সবচেয়ে জঘন্য ব্যবহার হচ্ছে, কোনও মেয়েকে পছন্দ করলে তাঁকে বিয়ে করার জন্য এই যাদু করা হয়। এই যাদু কখনো তাবিজের নামে, কখনো দোয়া-কালামের নামে ভণ্ড কবিরাজরা করে থাকে। সাধারণ মানুষ না বুঝে ঈমান আমলের ক্ষতি করে।
তবে সবচেয়ে বেশি এই যাদু করে বউ জাতি! অনেক মহিলা স্বামীর ব্যাপারে সন্দেহ করে, সে বাহিরে গিয়ে অন্য কারো সাথে কোনো গুনাহ করছে কিনা! তখন কবিরাজ বাবার কাছে গিয়ে ধর্ণা দেয়। আমরা আলোচনা স্বামী-স্ত্রী উল্লেখ করেই করবো, বাকিদের ক্ষেত্রে এ অনুযায়ী মিলিয়ে নিবেন।

খেয়াল রাখা উচিৎ প্রিয় ভাই ও বোনেরা! এটা অনেক বড় গুনাহ। মুসনাদে আহমাদ এবং সুনানে আবু দাউদের এক হাদিসে আছে, রাসুল স. বলেছেন- ‘তিওয়ালা শিরক’। (আবু দাউদ:৩৮৮৩)
আর মুহাদ্দিসরা ‘তিওয়ালা’ শব্দের অর্থ করেছেন ‘আসক্ত করার যাদু’। উদাহরণস্বরূপ ইবনুল আসির রহ. এর বক্তব্য দেখা যেতে পারে (নিহায়া ১/২২২) এছাড়া মোল্লা আলি ক্বারি রহ. এবং ইমাম খাত্তাবি রহ.ও অনুরূপ অর্থ করেছেন। তাহলে বুঝা যাচ্ছে, এই যাদু শুধু গুনাহই না, ঈমানের জন্যও ক্ষতিকর! আমাদের সাবধান হওয়া উচিৎ।

তো এই যাদুর লক্ষণগুলো সাধারণত প্রকাশ্যই বুঝা যায়। যেমন-

১. সবসময় বউয়ের চিন্তা মাথায় ঘুরে, বাড়ির বাহিরে থাকতে পারেনা। বাড়িতে থাকলেও সারাদিন বউয়ের পিছেপিছে ঘুরে। অথবা বউয়ের সাথে যখনতখন শুধু ‘ইয়ে’ করতে ইচ্ছে হয়!

২. কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই কারো প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্ত হয়ে যাওয়া। এটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতেও সন্দেহজনক।

৩. যাকে অপছন্দ করতেন বা পাত্তা দিতেন না। হঠাৎ তেমন কোনো কারণ ছাড়াই তাঁর প্রেমে পড়ে যাওয়া!!

৪. কোনো বাছবিচার ছাড়াই কারো কথা অন্ধের মত মানতে শুরু করা, পরে কখনো যদিওবা এটা বুঝতে পারেন, তবুও অজানা কারণে নিজেকে তাঁর প্রতি বাধ্য মনে হয়!

তবে একটা বিষয় হচ্ছে, প্রচলিত যাদুগুলোর মধ্যে এই যাদুটার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উল্টাপাল্টা ইফেক্ট হয়। যেমন-

৪. কখনো আসক্ত হওয়ার বদলে অপছন্দ মনোভাব বেড়ে যায়, এমনকি কেউকেউ এজন্য বউকে তালাকও দিয়ে দেয়!

৫. এই যাদুর প্রভাবে কখনো প্রায় পাগল বা অন্য অসুখে আক্রান্ত হয়।

৬. কখনো বউ বাদে বাকি সবাই যেমন, ভাইবোন বাবামা সবার প্রতি বিদ্বেষী হয়ে যায়। এমন অনেক কিছুই হয়।

এই যাদুর ক্ষেত্রে সাধারণত জ্বিনের সাহায্য নেয়া হয় না। কিছু খাইয়ে বা হাঁটাচলার রাস্তায় পানি ঢেলে দিয়ে যাদু করা হয়। এজন্য রুকইয়া করার সময় জ্বিন ভর করবে এমন সম্ভাবনাও নেই। তাই এই যাদুর ক্ষেত্রে আশা করার যায় সেলফ রুকইয়াও যথেষ্ট হবে। তবে যদি সাথে অন্য সমস্যাও থাকে সেটার কথা ভিন্ন।

আসক্ত করার যাদুর জন্য রুকইয়া:

১. রুগীর কাছে বসে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়বেন। সাথে সুরা তাগাবুন এর ১৪, ১৫, ১৬ এই তিন আয়াত যোগ করুন। রুকইয়ার মধ্যে কোরআন এর ধারাবাহিকতা অনুযায়ী সুরা হাশরের ৪ আয়াত পড়া শেষে এগুলো পড়তে পারেন, অথবা একদম শুরুতে বা শেষেও পড়তে পারেন, এটা তেমন কোনো বিষয় না। তো যদি সমস্যা থাকে তবে খুব অস্বস্তি বোধ করবে, খুব মাথাব্যথা, বুকে ব্যাথা, পেটব্যাথা করতে পারে, বমি বমি লাগতে পারে, এই যাদুর আক্রান্ত হলে কখনো শরীর প্রায় অবশ হয়ে আসে… এরকম কিছু হলে বুঝে নিতে হবে যাদু আক্রান্ত।

২. তখন “আয়াতুল কুরসি, সুরা আ’রাফ ১১৭-১২২, ইউনুস ৮১-৮২, সুরা ত্বহা ৬৯” এই আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। সাথেসাথেই যদি বমি হয়, তবে বেশ ভালো কথা আশা করা যায় অল্প কদিনেই একদম ভালো হয়ে যাবে। এরপর প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিন এবং ৩ সপ্তাহ পর আবার দেখা করতে বলুন।

৩. তিন সপ্তাহ পর আবার শুরু থেকে রুকইয়া করে দেখুন, সমস্যার একদম ভালো হয়ে গেলে তো আলহামদুলিল্লাহ! হয়েই গেলো, আর পুরাপুরি ভালো না হলে তো বুঝতেই পারবেন, আবার সেইম প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিন। ইনশাআল্লাহ আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাবে।

আসক্ত করার যাদুর জন্য সেলফ রুকইয়া:

১. এই যাদুর ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেলফ রুকইয়া যথেষ্ট হয়ে যায়, তবে সময় লাগতে পারে। ধৈর্য ধরে সমস্যা একদম ভালো হয় পর্যন্ত ট্রিটমেন্ট করে যেতে হবে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সেলফ রুকইয়া করবেন স্ত্রী যেন না জানে, জানলে আবার যাদু করতে পারে।এজন্য সতর্ক থাকতে হবে।

২. প্রথমে ভালোভাবে পাক-পবিত্র হয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন। এরপর দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে আপনার সমস্যা থেকে ‘পরিত্রাণের’ জন্য এবং সুস্থতার জন্য দু’আ করে দরুদ শরিফ ইস্তিগফার পড়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করুন। এক বোতল পানি হাতের কাছে রাখুন। প্রথমে সিহরের রুকইয়া (ডাউনলোড লিস্টে ২নংটা) বা অন্য কারো কমন রুকইয়া শুনুন। সমস্যা থাকলে তো অবশ্যই বুঝতে পারবেন, যেমন: অনেক ঘুম ধরবে, মাথাব্যথা পেটব্যাথা করতে পারে, বমি বমি লাগতে পারে, হাতপা অবশ হয়ে আসতে পারে। এরকম কিছু হলে বুঝে নিবেন সমস্যা আছে। আর এই যাদুর ক্ষেত্রে সাধারণত বুঝাই যায়, উপরেও কিছু লক্ষণ বলেছি সেগুলো মিলিয়ে নিন।

৩. যদি বুঝতে পারেন সমস্যা আছে। তবে এক গ্লাস পানি নিয়ে “আয়াতুল কুরসি, সুরা আ’রাফ ১১৭-১২২, ইউনুস ৮১-৮২, সুরা ত্বহা ৬৯” এই আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। সাথেসাথে যদি বমি হয়ে তবে বেশি ভালো, অল্প কদিনেই ইনশাআল্লাহ সেরে যাবে। সমস্যা একদম ভালো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত নিচের প্রেসক্রিপশন ফলো করুন।

৪. তিন সপ্তাহ পর আবার রুকইয়া করে দেখুন, সমস্যা বুঝতে পারলে প্রেসক্রিপশনের মেয়াদ বাড়িয়ে নিন।

প্রেসক্রিপশন:

১. একটা বোতলে পানি নিয়ে “সুরা বাক্বারা ২৫৫(আয়াতুল কুরসি), আ’রাফ ১১৭-১২২, ইউনুস ৮১-৮২, সুরা ত্বহা ৬৯” আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দিন। উপরে বলা অনুযায়ী এখনি কিছুটা খেতে হবে, বাকিটা রেখে দিবে। আর এরপর তিন সপ্তাহ এই পানি দুইবেলা করে খেতে হবে।

২. চাইলে প্রতিদিন কিছুক্ষণ রুকইয়া শুনতে পারে, এক্ষেত্রে সাধারণ রুকইয়া সাজেসটেড, অথবা সুরা তাগাবুন শুনতে পারেন।

৩. রুকইয়া ভালোভাবে কাজ করার জন্য গানবাজনা শোনা যাবেনা। নামাজ-কালাম ঠিকঠাক পড়তে হবে। ফরজ ইবাদাতে যেন ত্রুটি না হয়। (মেয়েদের পর্দা করাও ফরজ)

৪. সকাল সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া, এবং ৩ ক্বুল (সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস)এর আমল ঠিকঠাক করবেন।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: 

প্রথমত: এই যাদুর ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে সাধারণত পরিচিত জনেরাই এই যাদু করে, নিজের বউ-ই করে! তাই আপনি যে চিকিৎসা করছেন এটা যেন সে না জানতে পারে। জানলে আবার যাদু করার সম্ভাবনা আছে, তাই সতর্ক থাকতে হবে, এটা নিয়ে গল্পগুজব করা যাবেনা। সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরেও না। কারো কাছে গিয়ে সরাসরি রুকইয়া করালেও এটা খেয়াল রাখবেন, আপনি ট্রিটমেন্ট করাচ্ছেন যে যাদু করেছে সে যেন এই খবর না জানতে পারে।

পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, যেন সর্বপ্রকার শত্রুতা এবং ক্ষয়ক্ষতি থেকে যেন আমাদের হিফাজত করেন।

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

57 − fifty six =