ruqyahbd

[পর্ব-২] অনাহূত ভাবনা ও তার প্রতিকার (ওয়াসওয়াসা রোগ)

<< প্রথম পর্ব

(মূলঃ মুফতি তাক্বি উসমানী দা.বা. এর প্রবন্ধ)

৬. আরেকটি পদ্ধতি

আমার ওয়ালিদ ছাহেব (মুফতি শফী রহ.) বলতেন, যদি কোথাও অন্ধকার হয়ে আসে তবে তার সমাধান এই নয় যে, তুমি লাঠি নিয়ে অন্ধকার তাড়াতে নেমে পড়বে। কেননা, এভাবে অন্ধকার দূর হবে না। অন্ধকার দূর করার পন্থা এই যে, তুমি একটি বাতি জ্বালিয়ে দাও। বাতির আলো যেখানে পৌঁছবে সেখান থেকে অন্ধকার বিদায় নিবে।

মানুষের মনে শয়তানের পক্ষ থেকে যেসব কুচিন্তা, প্রশ্ন-সংশয় সৃষ্টি হয় সেগুলোও এক ধরনের অন্ধকার। একে তাড়ানোর চেষ্টায় লেগে যাওয়া সমাধান নয়; বরং তোমার মন-মস্তিষ্কে আল্লাহর স্মরণের বাতি জ্বালিয়ে দাও। বন্দেগী ও আনুগত্যের চেরাগ জ্বালিয়ে দাও। দেখবে আঁধার দূর হয়ে গেছে।

৭. অন্য চিন্তায় মগ্ন হও

এ ধরনের চিন্তা যদি বেশি আসে তাহলে এর সমাধান হযরত থানভী রাহ. এভাবে দিয়েছেন যে, এ ক্ষেত্রেও তা দূর করার চিন্তা ঠিক নয়। কেননা, যতই দূর করার চেষ্টা করবে ততই তা জোরদার হবে। এ সময় অন্য কাজে মনোনিবেশ কর কিংবা ভিন্ন চিন্তায় মশগুল হও।

– দর্শন শাস্ত্রে আছে-মানুষের চিন্তা এক মুহূর্তে দুই বিষয়ে নিবদ্ধ হয় না।

তুমি যদি নিজেকে ভিন্ন কাজে বা ভিন্ন চিন্তায় মশগুল কর তাহলে প্রথম চিন্তা এমনিই দূর হয়ে যাবে।

চিন্তা দূর করার কোনো অযীফা নেই

উপরের আলোচনায় হযরত রাহ. এই কথাটাই বলেছেন যে, ‘অনাহূত ভাবনার সমাধান ভ্রুক্ষেপহীনতা ছাড়া আর কিছু নয়।’ অর্থাৎ এর অন্য কোনো সমাধান নেই। লোকেরা আবেদন করে যে,নানা ধরনের ভাবনা মনে আসে, কোনো অযীফা দিন, যাতে এগুলো দূর হয়। তো হযরত বলছেন যে, এমন কোনো অযীফা নেই। এর একমাত্র সমাধান হল চিন্তা তাড়ানোর চিন্তা না করা।

৮. ঔষধ উদ্দেশ্য নয়, সুস্থতা উদ্দেশ্য তবে

এরপর একটি সূক্ষ্ম কথা বলা হয়েছে। তা এই যে, ‘ভ্রুক্ষেপহীনতাকে মাধ্যম মনে করবে না, একেই মূল কাজ বলে মনে করবে। ভ্রুক্ষেপহীনতার দ্বারা চিন্তা-খেয়াল দূর হোক বা না হোক।’ অর্থাৎ উপরে যে বলা হয়েছে ভ্রুক্ষেপহীনতাই চিন্তা দূর করার উপায়। এর অর্থ এই নয় যে, ভ্রুক্ষেপহীনতা ঔষধের মতো নিছক উপায় মাত্র। দেখুন, মানুষ যখন কোনো রোগের জন্য ঔষধ ব্যবহার করে তখন তার মূল উদ্দেশ্য থাকে আরোগ্য লাভ করা। যেহেতু ঔষধ সেবন আরোগ্য লাভের উপায় তাই অবশ্যই এর গুরুত্ব রয়েছে কিন্তু তার গুরুত্ব আরোগ্য লাভের উপায় হিসেবেই, উদ্দেশ্য হিসেবে নয়। মূল উদ্দেশ্য তো আরোগ্য লাভ করা। এজন্য ঔষধ সেবনের পর মানুষ সুস্থতার অপেক্ষায় থাকে। একদিন, দুইদিন, তিন দিন ঔষধ সেবনের পরও যদি সুফল না আসে তাহলে মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়।

৯. এই সমাধান নিছক ঔষধ নয়

হযরত রাহ. বলছেন যে, অনাহূত ভাবনা দূর করার জন্য যে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করা-এটাকে নিছক ঔষধ মনে করবে না। অর্থাৎ এই ব্যবস্থা প্রয়োগের পর চিন্তা দূর হল কি হল না এই অপেক্ষায় না থেকে নিজ কাজে মশগুল থাকবে। মনে রাখতে হবে যে, এটা নিছক মাধ্যম নয়, এটাই মূল কাজ। অতএব একদিন, দুইদিন, তিন দিন এই পন্থা অনুসরণের পরও যদি দেখা যায়, অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না তবুও তা পরিত্যাগ করা যাবে না। চিন্তার সমস্যায় সেদিকে মনোযোগ না দেওয়াই মূল কাজ। অতএব জীবনভর অবাঞ্ছিত চিন্তা থেকে নিষ্কৃতি না পেলেও এই পন্থাই অনুসরণ করে যেতে হবে। চিন্তা আসুক আপনি অন্য দিকে মনোযোগ দিন। আবার আসুক, আবার অন্য চিন্তায়, অন্য কাজে ব্যস্ত হোন। এটাই সমাধান এবং এটাই করণীয়।

১০. মানসিক প্রশান্তি উদ্দেশ্য নয়

এরপর হযরত রাহ. আরেকটি সূক্ষ্ম কথা বলেছেন। তা এই যে, ‘মানসিক প্রশান্তি লাভকে মূল লক্ষ বানাবে না।’ অর্থাৎ এই সব ভাবনা দূর হোক-এটা আপনি কেন কামনা করছেন? মানসিক প্রশান্তির জন্য? এই সব চিন্তা সর্বদা আপনার মন-মস্তিষ্ককে অস্থির করে রাখে, তাই স্থিরতা ও প্রশান্তির জন্য তা থেকে নিস্তার পাওয়া দরকার? এই সম্পর্কে হযরত রাহ.-এর বক্তব্য এই যে, প্রশান্তি লাভকে উদ্দেশ্য বানোনো যাবে না; বরং উদ্দেশ্য এই হবে যে, ওইসব ভাবনা থেকে মনকে মুক্ত করে প্রয়োজনীয় কাজে মনোনিবেশ কর। যদি প্রশান্তি লাভই কাম্য হয় তবে তো মনের চাহিদা পূরণই উদ্দেশ্য হল।

 

শেষ পর্ব >>

Facebook Comments

Default Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

+ fifty five = 58