রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি গ্রুপ পরিচালনার আদ্যোপান্ত

রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি গ্রুপ কিভাবে কাজ করে সেটা জানার আগে রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপ কি, কি নিয়ে কাজ করে, কারা এখানে আসেন- এসব ব্যাপারে দুটো কথা লেখা যাক।
.
রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি গ্রুপ মূলত ইসলামী চিকিৎসা ব্যবস্থার একটা বড় অংশ “রুকইয়াহ” তথা ঝাড়ফুঁক নিয়ে কাজ করে। মূলত বদনজর, জিন, জাদু সংক্রান্ত রোগগুলোর ব্যাপারে পরামর্শ দেয়ার উদ্দেশ্য হলেও প্রচলিত চিকিৎসাবিজ্ঞানে সংজ্ঞায়িত করা সমস্যাগুলোর জন্যও পরামর্শ দেয়া হয় যা ডাক্তারি পরামর্শের পাশাপাশি ফলো করা যায়। স্বভাবতই এখানে বদনজর, জিন, জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাহায্য চেয়ে থাকেন। এছাড়াও ক্যান্সার, প্যারালাইসিস ইত্যাদি রোগে ভুগছেন এমন ব্যক্তিরাও পরামর্শ নিয়ে থাকেন।
.
কাজেই বোঝা গেল অসুস্থ ব্যক্তিরাই এই গ্রুপের সেবা প্রার্থী এবং তাদের যারা পরামর্শ দিচ্ছেন তারা “অসুস্থতার” ব্যাপারে পরামর্শ দিতে অভিজ্ঞ। এখানেই অন্য গ্রুপ থেকে রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি আলাদা হয়ে গেল। নির্দিষ্ট ব্যক্তিরাই এখানে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের থেকে পরামর্শ নিবেন। সবাই সবধরনের সমস্যা লিখবে, আর সবাই যার যার মত পরামর্শ দিবে এমন গ্রুপ না এটা।
.
কিছুদিন পর পর ফেসবুকের নিত্যনতুন কর্মকাণ্ডে গ্রুপ পরিচালনা ক্ষেত্রে আমাদের প্রায়ই বেকায়দায় পড়তে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। সেসব অতিক্রম করার জন্য বার বার পদ্ধতিগত পরিবর্তন করতে হয়েছে।
.
১. রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি গ্রুপের একটি বৈশিষ্ট্য হল Strong Comment Moderation. প্রায় প্রতিটি পোস্টের সব কমেন্ট চেক করা হয়। মেম্বাররাও রিপোর্ট করেন মা শা আল্লাহ। কমেন্টের উপর ভিত্তি করে Remove, Remove Member, Blcok Member ইত্যাদি পদক্ষেপ নেয়া হয়। কমেন্ট করে বেশিক্ষণ টিকতে পারা যায় না এই গ্রুপে। ভাল কমেন্ট হলেও একশন নেয়া হতে পারে। কারণ আগেই বলেছি, এই গ্রুপে নির্দিষ্ট মানুষজন নির্দিষ্ট মানুষজন থেকে পরামর্শ নিয়ে থাকে। অন্যদের কমেন্ট করা উচিত হবে না। এতে কারও আপত্তি থাকলে গ্রুপ থেকে চলে গেলে কেউ আটকাবে না।
.
২. নতুন সদস্য না নেয়া। পাব্লিক গ্রুপ হবার পরেও নতুন সদস্য নেয়া হত না। কারণ নতুন মেম্বারদের অনেকে এসে গ্রুপে তুলকালাম শুরু করতেন। এখানে কমেন্ট, ওখানে কমেন্ট, হুজুর-কবিরাজদের ফোন-ঠিকানা দেয়া শুরু করতেন। এখন আর যদিও সদস্য যোগ করা বন্ধ করা যায় না। কিন্তু প্রথমবার কমেন্ট/পোস্ট করার আগে এডমিন Approval লাগবে। মন্দের ভাল আর কি।
.
৩.১ কোন পোস্ট এপ্রুভের আগে অনেক কিছু দেখা হয়। প্রথমেই দেখা হয়, উক্ত ব্যক্তির প্রোফাইল ছবি ঠিক আছে কিনা। না থাকলে অনেকসময় ম্যানশন করে পরিবর্তন করতে বলা হয়। না করলে ডিলিট করা হয়। অনেক সময় সরাসরি ডিলিট করা হয়
.
৩.২ ব্যাকগ্রাউন্ড আছে কিনা দেখা হয়। থাকলে চেঞ্জ করতে বলা হয় ম্যানশন করে অথবা সরাসরি ডিলিট করা হয়।
.
৩.৩ পোস্টে ছবি থাকলে অটোমেটিক পোস্ট ডিলিট হয়ে যাবে। অনেক তাবিজের ছবি এমনকি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ছবিও দেন পোস্টের সাথে। এসব Automatically ডিলিট হয়ে যায়।
.
৩.৪.১ অপ্রাসঙ্গিক পোস্ট হলে সরাসরি ডিলিট করা হতে পারে। যেমন, কেউ খেলার আপডেট দিচ্ছেন, লাইভ শেয়ার করছেন। ডিলিটের পাশাপাশি এদের গ্রুপ থেকে ব্লকও করা হয়।
.
৩.৪.২ অনেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা, তাবিজের ব্যাখ্যা চান। এগুলো আমাদের গ্রুপের আলোচ্য বিষয় নয়। এইগুলো ফিডব্যাক দিয়ে ডিলিট করা হয়। অথবা এপ্রুভ করে বলা হয় যে, আমরা এসব ডিল করি না। এরপর কমেন্ট অফ।
.
৩.৫ অনেকে আপডেট পোস্ট আগের পোস্টের কমেন্টে না দিয়ে নতুন করে পোস্ট করেন। এটাও চেক করা হয় পোস্ট এপ্রুভ করার আগে। এমন হলে কপি করে আগের পোস্টের কমেন্টে পেস্ট করে পেন্ডিং পোস্ট ডিলিট করা হয়।
.
৩.৬ অনেকে একই পোস্ট একাধিকবার করেন। এতে আমাদের কাজ বাড়ে। তখন সবচে পুরনো পোস্ট রেখে নতুনগুলো ডিলিট করা হয়।
.
এতগুলো স্টেপ পার করার পর একটা পোস্ট এপ্রুভ হয়।
.
৩.৭ পোস্ট এপ্রুভ হয় সিরিয়ালে। মানে যে আগে পোস্ট করবেন তার পোস্ট আগে দেখা হবে। ধৈর্য ধরতে না পেরে অনেকে আগের পোস্ট ডিলিট করে নতুন করে আবার পোস্ট করেন। এতে তার সিরিয়াল আরও পিছিয়ে যায়।
.
৩.৮ নতুন মোডারেটদের ইচ্ছামত পোস্ট দেখার সুযোগ দেয়া হয়। সেখানে সিরিয়াল নেই। যেমন, একজন পোস্ট করলো “রুকইয়াহ কি?” বা “রুকইয়াহ অডিও পেইজের লিংকটা দিন”। সেক্ষেত্রে নতুনদের মধ্যে কেউ এটা সিরিয়াল ভেঙেই এপ্রুভ করতে পারেন। এরপর অভিজ্ঞতা বাড়লে তখন পুরনোদের মত পোস্ট দেখেন।
.
৩.৯ আপডেট পোস্টও অনেক সময় সিরিয়াল মেনটেন করে এপ্রুভ করা হয় না। আগে আগে এপ্রুভ করা হয়। কাজেই যারা চান আপনার পোস্ট আগে এপ্রুভ হোক তারা এনাউন্সমেন্ট পড়ে নিজেরা শুরু করেন। এরপর কিছুদিন করে উপরে “আপডেট পোস্ট” লিখে আপডেট দিবেন।
.
৩.১০ “আমার সমস্যাটা সমস্যা, আমার কষ্ট হচ্ছে, জরুরী পোস্ট” – এভাবে গ্রুপে এখানে সেখানে কমেন্ট বা বার বার পোস্ট করতেই থাকা হল স্বার্থপরতার লক্ষন। এইগ্রুপ সমস্যা আক্রান্তদের নিয়েই কাজ করে। মনের আনন্দে কেউ এখানে পোস্ট করে না। কাজেই নিজের সমস্যাকে বড় করে দেখা, প্রায়রিটির আশাবাদ করা স্বার্থপরতাই বটে। যাদের জরুরী ভিত্তিতে সার্ভিস দরকার তারা গ্রুপের পেইড কন্সালটেন্সি ( ৩০০ টাকার বিনিময়ে) নিতে পারেন।
.
৪.১ গ্রুপে মূলত সেলফ রুকইয়াহর (যা নিজে নিজে করা যায়) পরামর্শ দেয়া হয়। একে তো গ্রুপের মাধ্যমে সরাসরি রুকইয়াহ করা সম্ভব নয়, তার উপর সবাই রুকইয়াহ সেন্টারে যাবার মত পরিস্থিতিতে থাকেন না। অনেকে এমন জায়গায় থাকেন যার আশেপাশে কোনও সেন্টার অথবা রাক্বি (রাক্বি কে/কি এই ব্যাপারে লিংক কমেন্টে দেয়া হল) নেই। তাদেরকে সেলফ রুকইয়াহর পরামর্শ দেয়া হয়, এতে করে আল্লাহর ইচ্ছায় অনেকে আরোগ্য লাভ করেন। আর প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই সেন্টারে যাবার অথবা রাক্বির সাথে যোগাযোগ করার কথা বলা হয়ে থাকে।
.
৪.২ নানান কারণে ইনবক্সে আমরা পরামর্শ দেই না। গ্রুপে পোস্ট দিতে বলি। কারও প্রাইভেসির সমস্যা থাকলে ভুয়া আইডি খুলে পোস্ট করতে বলা হয়। আর এখনতো নাম প্রকাশ না করে পোস্ট করার সুযোগ ফেসবুক দিয়েছে।
.
৫. পরামর্শ দিয়েই কমেন্ট অফ করা হয় না। কারণ পরামর্শ যিনি নিয়েছেন তিনি পরামর্শ বুঝতে পেরেছেন কিনা সেটা জানার দরকার আছে। তারও টুকটাক প্রশ্ন থাকতে পারে। সেগুলো উত্তর দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করতে চেষ্টা করতে হয়। এরপর যদি সে কমেন্ট অফ করে দেয় তাহলে ভাল। পরে আপডেট দেয়ার সময় অন করে আপডেট দিবে। আমরা অফ করলে তিনি আর অন করতে পারবেন না। তখন আবার আমাদেরকে অন্য কোথাও জানাতে হবে। আমরা খুলে দিব, এরপর তিনি আপডেট জানাবেন, এরপর আমরা দেখবো। বিরাট হ্যাপা আর সময় নষ্ট।
.
৬. সবচে’ বেশি ঝামেলা করেছে ফেসবুকের নোটিফিকেশন সিস্টেম। এর এলগরিদম খুবই বাজে। আগে ৯৯ টার বেশি নোটিফিকেশন দেখাতো না। লাইকাররা লাইক আক্রমণ করলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নোটিফিকেশন হারিয়ে যেত। তাই কমেন্টে লাইক দিতে মানা করা হত। এখন কমেন্ট করলে, ম্যানশন দিলে নোটিফিকেশন আসে না, লাইক দিলে আসে! এখন আবার লাইক দিতে বলা হয়। এরপরেও অনেক পোস্টের নোটিফিকেশন পাওয়া যায় না।
.
৭. গ্রুপ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একা নেয়া হয় না। যেমন, নতুন ভলান্টিয়ার নেয়া হবে কিনা, কাউকে এডমিন/মোডারেটর দেয়া হবে কিনা ইত্যাদি সিদ্ধান্ত পুরনো এডমিনরা নেন। দরকার মনে করলে সমস্ত এডমিনদের সাথেও পরামর্শ করা হয়। তবে কিছু ব্যক্তিগত লেখাও এডমিনগণ (যা রুকইয়াহ ও দাওয়াহ সংক্রান্ত এবং বিশেষ ইসলামি উপলক্ষে লেখা) গ্রুপে শেয়ার করে থাকেন।
.
৮. মাথায় রাখতে হবে একজন এডমিন/ভ্লান্টিয়ার/ মোডারেটগনের রুজি-রুটি গ্রুপ নির্ভর নয়। “গ্রুপের” কোনও সেন্টার নেই, আমরা ধরে ধরে সবাইকে সেন্টারে পাঠাচ্ছি এমন নয়। আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক কাজ শেষ করে তারপর গ্রুপে “ভলান্টিয়ারি” সময় দেয়া হয়। এই সময়টা সংক্ষিপ্ত। এই সংক্ষিপ্ত সময়টুকু যদি কমেন্ট মোডারেশন, প্রোফাইল ছবি চেক ইত্যাদি সামলাতে চলে যায় তাহলে আর পোস্ট দেখার সময় পাওয়া যায় না। বর্তমানে গড়ে ৭০-৯০ টা পোস্ট পড়ে প্রতিদিন। এই পোস্টগুলো যারা আগে থেকেই মেম্বার তাদের। নতুন মেম্বার না। এর বেশি পরিমাণ পোস্ট দেখা সম্ভব না হলে পোস্ট জমতে থাকে। কাজেই যিনি পোস্ট করেছেন তিনি ছাড়া যদি আর কেউ কমেন্ট না করেন, ফ না লিখেন, ম্যানশন না দেন তাহলে আমাদের সময় সাশ্রয় হয়। আমরা আরও বেশি মানুষকে সময়টা দিতে পারি।
.
৯. মেম্বারদের টুকটাক প্রশ্নের জবাব দিতে লাইভ প্রশ্নোত্তর করা হয় মাঝে মাঝে। এছাড়া আগের গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট রিপোস্ট করা হয়।
.
১০. রিসোর্স ম্যানেজমেন্টও আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। গ্রুপের এডমিন, মোডারেটর, ভলান্টিয়ারগন এবং গ্রুপের পিন পোস্ট, এনাউন্সমেন্ট, ফাইল সেকশন, গ্রুপেই পেইজ, ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, টেলিগ্রাম চ্যানেল, উইকিপিডিয়া পেইজ ইত্যাদি হল গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স। এছাড়া এডমিনদের গ্রুপ, ভলান্টিয়ারদের গ্রুপ, রাকিদের গ্রুপ, শিক্ষানবিসদের গ্রুপও গুরুত্বপূর্ণ। এসব রিসোর্স উন্নতকরণ, সঠিকভাবে প্রয়োগ এবং রক্ষণাবেক্ষণ করাও আমাদের কাজের মধ্যেই পড়ে।
.
১১. শুধু রুকইয়াহ-ই নয়, একজন সাহায্যপ্রার্থী যেন দ্বীনের লাইনে, আমলের লাইনে আগে বাড়েন সেদিকেও লক্ষ্য রাখার চেষ্টা করে পরামর্শ দেয়ার সময় কমেন্ট লেখা হয়। (এটাতে আমাদের কমতি আছে অস্বীকার করছি না।)
.১২. কবিরাজ, হুজুর-রূপী কবিরাজ, বৈদ্যদের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে কোনোরূপ ছাড় নেই। এমন ব্যক্তি পাওয়ার সাথে সাথে ব্লক করা হয়, তাদের পক্ষাবলম্বন করে যেকোনো কিছু লিখলে, কমেন্ট করলে সরাসরি ব্যান করা হয়। তাবিজ এবং এই জাতীয় যেকোনো কিছু কারও সাথে থাকলে তাকে পরামর্শ দেয়া হয় না। বরং তাকে এসব ভণ্ডামির স্বরূপ উন্মোচন করে আমাদের লেখা বিভিন্ন পোস্টের লিংক দেয়া হয়। এরপর সে ফিরে আসলে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হয়।
[এই পোস্ট লেখার উদ্দেশ্য হল, গ্রুপের সদস্যরা যেন আমাদের অবস্থা এবং অবস্থান উপলদ্ধি করতে পারেন। এছাড়া বড় বড় ইসলামি গ্রুপ যারা চালান তাদেরও হয়ত এখান থেকে গ্রহণ করার মত কিছু থাকতে পারে।
ধৈর্য ধরে যারা পুরো লেখা পড়েছেন তাদেরকে জাযাকুমুল্লাহ। ]

মন্তব্য করুন